Tuesday, January 31, 2012

একজন শ্বাশুড়ীর আম্মু হয়ে ওঠা

যে কোন ম্যারেজ কোর্সের একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে শ্বাশুড়ী বউয়ের সম্পর্ক নিয়ে। নাটক সিনেমায় বউ-শ্বাশুড়ীর খুটাখুটিকে পুঁজি করে চলে পর্বের পর পর্ব, শ্বাশুড়ী সংক্রান্ত জোক্সগুলো যে কোন দেশে, যে কোন ভাষায় মানুষ বুঝতে পারে। আবার, আড্ডার ঝড়ে, ফিকহের আলোচনায়, সিরিয়াস বা সেমি সিরিয়াস ব্লগে শ্বাশুড়ী-আলোচনা পড়লে বুঝা যায়, মানুষ সমাধান চাইছে, খুব অস্বস্তিকর একটা সম্পর্ককে স্বস্তিকর করতে চাইছে। আজীবন চারপাশে এ-ই দেখে এসেছি, শ্বাশুড়ী সম্পর্কে কখনই ভালো কথা শুনি নি তেমন। অনেকেই ভালো কথা বলতে চান, কিন্তু ভালো কথাগুলো দিয়ে যে কিছু ’কিন্তু’ ঢাকার চেষ্টা করছেন, সেই চেষ্টাটাও খুব প্রকট হয়ে যায়--’হাজার হোক আমার হাজবেন্ডকে এত ভালো মানুষ হিসেবে তো বড় করে দিয়েছেন তিনি’, কিংবা, ’মানুষের তো দোষ গুণ থাকবেই...’ ইত্যাদি। সব দেখে শুনে বিয়ের আগে থেকেই খুব ভয় পেতাম শ্বশুড়বাড়ি আর শ্বাশুড়ী নিয়ে। আমার নিয়মিত দোআর অংশ হয়ে গিয়েছিল ভালো শ্বাশুড়ীর জন্য দোআ!

আমি যখন জীবনে প্রথমবার কোনো পাত্রপক্ষের মুখোমুখি হচ্ছিলাম তিন বছর আগে, তখন আমার ডাক পড়তে তীব্র অস্বস্তি নিয়ে বসলাম পাত্রের মায়ের পাশের চেয়ারটায়। তিনি নিচু কণ্ঠে আমার সাথে টুকটাক কথা বলা শুরু করলেন, একটু পরে অল্প অল্প করে নিজের প্লেট থেকে আঙ্গুর, কমলা তুলে দেয়া শুরু করলেন আমার প্লেটে আর নিজের গ্লাস থেকে অর্ধেক জুসটুকু ঢেলে দিলেন আমার গ্লাসে। কোন উচ্ছ্বসিত অভয়বাণী না, অতিরিক্ত প্রগলভতা না, কেবল তাঁর শান্ত, ধীর স্থির উপায়ে আমাকে বুঝিয়ে দিলেন যে নিজের গ্লাস থেকে আমার গ্লাসে জুস ঢালতে বা প্লেটে নিজ হাতে খাবার তুলে দিতে তিনি দ্বিতীয়বার ভাবেন নি। এত আন্তরিক মায়ার ছাপ ছিল সেখানে, যে আমার ভিতর থেকে দুম করে সমস্ত অস্বস্তি কেটে গেল। পাত্রকে পছন্দ হওয়ার আগেই সেদিন পাত্রের মাকে পছন্দ হয়েছিল আমার!

সেই মায়াবতী মহিলা অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আমার ’আম্মুতে’ পরিনত হয়েছিলেন। আমার ’হুট বিয়ের’ খবর দেয়ার সময় মানুষকে বলছিলাম, পাত্রের চেয়ে আমার আসলে পাত্রের মা আর বোনকেই বেশি পছন্দ হয়েছে! গত তিন বছরে বুঝেছি, হিসাবে একটুও ভুল করি নি। এখনও আমি পরিপূর্ণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলতে পারি, “আমার শ্বাশুড়ী খুবই ভালো মানুষ”।
মানুষ শুনলে হয়তো বলবে আদ্যিখেতা করছি, কিন্তু সত্যি বলছি, আমাকে কেউ জীবিত মানুষদের মধ্যে ’রোল মডেল’ খুঁজতে বললে আমি যে কয়েকজনের নাম ভাবতে পারি, তার মধ্যে আমার শ্বাশুড়ী অন্যতম... শ্বাশুড়ী হিসেবে তো অবশ্যই, মানুষ হিসেবেও!
শুনি শ্বাশুড়ী আর বউয়ের মধ্যে ছেলের উপর আধিপত্যের লড়াইয়ের কথা, কিন্তু আমি সেটা টের পাই নি একদম। বিয়ের পরের দিনই নও বলেছিল ওর খুব প্রিয় মুহূর্ত সকালে ফজরের পরে আম্মুর সাথে চা খাওয়ার মুহূর্ত। আব্বু চা খায় না, তাই আম্মুর নিজের চা খেতে ইচ্ছা করলেই নাকি নওয়ের জন্য চা নিয়ে এসে দুই জন মিলে টুকটুক করে চা খান! তারপরেই ফজরের পরে দেখি আম্মু ট্রে দিয়ে দুই কাপ চা আর নাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন আমাদের রুমে। তিনি নাকি রান্নাঘরে কি কাজ করতে করতে চা খাবেন। বুঝলাম আধিপত্যের লড়াইটা আম্মু করবেন না, প্রিয় মুহূর্তটা ছেলে আর বউয়ের জন্য ছেড়ে দিয়ে চলে গেলেন। আমি বুঝি তা হতে দিবে? প্রথম দিকে বেশ জোর করেই নিয়ে আসা শুরু করলাম আম্মুকে, এক সাথে বসে চা খাওয়ার জন্য। সমস্যা হচ্ছে, তিনি এত আগ্রহ নিয়ে চা বানিয়ে আনছেন, কিন্তু আমি নিয়মিত চা খাই না। তাই কয়েক দিন যেতেই আম্মুকে বললাম আমার জন্য চা না বানাতে। ভাবলাম, ওরা দুই জনই শুধু খাক না, ঠিক আগের মত! আম্মু কি আর তা হতে দিবেন, পরের দিন থেকে চা আসা বন্ধ হলো ঠিকই, কিন্তু কাপের সংখ্যা ঠিকই তিন... তৃতীয় কাপটায় গনগনে গরম হরলিক্স! আম্মুর অকাট্য যুক্তি--সবাই মিলে চা খাচ্ছে, আমি কিভাবে শুকনো মুখে বসে থাকি? যেই আমি সারা জীবন দুধ থেকে পালিয়ে বেড়ালাম, সেই আমিই আম্মুর ভালোবাসার কাছে পরাজিত হয়ে ঠিকই দুধ-হরলিক্স খাওয়া শুরু করলাম!

একদিন আড়াল থেকে শুনে আরেকজন রিপোর্ট করলো আম্মু এক নব্য শাশুড়ীকে কাউন্সেলিং করছেন এভাবে, ’আমার তো ইচ্ছা করে আমার ছেলের বউদের আমার নিজের মেয়ের চাইতেও বেশি আদর করতে। ওরা ওদের নিজেদের পরিবেশ আর নিজেদের ফ্যামিলি রেখে আমার সাথে মানানোর চেষ্টা করছে, ওদেরই তো বেশি আদর দরকার।’ খতিয়ে দেখলাম আম্মু আসলে এক বিন্দুও বাড়িয়ে বলছেন না। আম্মুর বউগুলো একেকজন একেক ধাঁচের—একেবারে ফতুয়া-জিনস থেকে শুরু করে আরেক এক্সট্রিমে আমার মত বোরখাওয়ালী বউ। কিন্তু সব বউদের সাথেই তিনি আশ্চর্য রকমের মানিয়ে চলেন এবং আদরে আদরে ভরিয়ে রাখেন। বউদের জোর করে খেতে বসিয়ে দিবেন ছেলেদের পাশে পাশে, নিজে কিন্তু ইনসুলিন নেয়ার অজুহাতে খেতে বসবেন না! তারপর সেই সুযোগে জোর তদারকি চালাতে থাকবেন, এই রান তুলে দিচ্ছেন বড় বউয়ের প্লেটে, তো মাছের মাথা দিচ্ছেন মেঝ বউয়ের প্লেটে। শ্বশুড়বাড়িতে থাকলে আমার ওজন বাড়াটা অবধারিত হয়ে যায়! প্রথম প্রথম অবাক হতাম, বউদের যে শ্বাশুড়ীরা তুলে খাইয়ে দেয়, এটা আমি আগে কখনও শুনি নি। আমার মনে আছে বিয়ের আগে একদিন মায়ের সাথে ঝগড়া করছিলাম, আমাদের সমাজে জামাইদের এত আদর কেন, বউদের তো সেই আদর নেই, অথচ দু’জনই তো অন্য বাড়ির! বিয়ের পরে তওবা করেছি, এত আদরের অত্যাচার আমার দরকার নাই রে বাবা, সব আদর জামাইদেরই থাকুক!

বউদের কমপ্লেইন শুনি শ্বাশুড়ীকে নাকি কিছুতেই খুশি করা যায় না, অথচ আমরা আম্মুকে এই কোয়ার্টারে ফেল করাতে পারি না কিছুতেই! আমি বিদেশে বড় হওয়া বলে ’না-বুঝা’ সংক্রান্ত ভুল ভাল হয় আমার অনেক বেশি। কখনও মিইয়ে যাওয়া মুড়ি তেল পেঁয়াজ দিয়ে মাখিয়ে সামনে হাজির করি, কখনও ভুল মানুষের সামনে ভুল কথা বলে ফেলি, কখনও খেয়াল করি না পরনে জামাটা কত বেশি আটপৌরে, কখনও কাজ করতে বলার পরেও দিব্যি ভুলে গিয়ে পরে এসে দেখি কাজটা কে যেন করে ফেলেছে! আর কতবার যে আম্মুর সাথে কথা বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়েছি (সংজ্ঞা অনুযায়ী বেয়াদবীর চূড়ান্ত)! কিন্তু কখনই সরব, নিরব কোন অনুযোগ শুনি নি আম্মুর, আড়ালেও না, সামনা সামনিও না। বরং উচ্ছ্বসিত, ’আনরিজারভড’ প্রশংসা শুনি। সামান্য কিছু করলাম, মুরগি রান্না করলাম কি সালাদ কাটলাম, অথবা একটা সস্তা ব্যাগই কিনে দিলাম, অল্প সময়ের মধ্যেই দেখি সবাই জানে! মানুষের মুখের উচ্চারিত শব্দগুলোর কত যে শক্তি, সেটা বুঝি আম্মুকে দেখে। এই যে যখনই নও দেশে ফোন করে, আম্মু গলায় অনেকখানি আদর ঢেলে জিজ্ঞাসা করেন, ’সন্ধ্যা বুড়ি/সন্ধ্যা মনি কি করে?’ লাউড স্পীকারে সেটা শুনেই আমার বুকের ভিতরটা ভালো লাগায় ভরে যায়। বাংলাদেশের কোন শ্বাশুড়ী পুত্রবধুকে মনি/বুড়ি বলে সম্বোধন করেন!

শুনতাম, বউরা নাকি ভুল করবে বলেই ওঁত পেতে থাকে শ্বাশুড়ীরা আর খোঁটা দেয় বাপের বাড়ির কুশিক্ষার! অথচ কত যে ভুল করেছি গত তিন বছরে। সেবারের কথাই ধরুন, তখন বিয়ের একেবারে প্রথম দিকে, দু’জনেই দু’জনের সাথে অ্যাডজাস্টমেন্টের প্রাথমিক অবস্থা, বুঝার চেষ্টা করছি। সাথে তো ফ্যামিলির সাথে অ্যাডজাস্টমেন্টের ব্যাপার আছেই। সে সময় একদিন একটা ছোট ভুল বুঝাবুঝি হয়ে গিয়েছিল আমার দোষে, পুরা ফ্যামিলির সামনে যখন কথা বলা দরকার ছিল, তখনও চুপ ছিলাম বলে। আমার কথা হচ্ছে, ’নতুন বউ’ আমি, এত কথা কি করে বলি? কিন্তু পরে আমার ’অযাচিত বিনয়ের’ কথা শুনে নও খুব রাগ টাগ করে মাথা ঠান্ডা করতে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। আমার সে কি অভিমান লাগছিল! একটু পরেই আম্মু ঘরে এসে কি কি বলা শুরু করলো, কিন্তু আমি তখন কিছুই শুনতে পারছি না, অভিমানে কান ঝাঁ ঝাঁ করছে, কান্নাটা দলা পাকিয়ে গলার কাছে, মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হচ্ছে না। আম্মুর গলাতেও বুঝি বা একটু বেশিই মায়া ছিল সেদিন, কিছুক্ষন পরে আর থাকতে না পেরে আম্মুকে জড়িয়ে ধরে আকুল হয়ে কান্না শুরু করে দিলাম । ভিতরে ভিতরে আমি প্রচন্ড লজ্জায় মরে যাচ্ছিলাম, জামাইয়ের সাথে রাগ করে শ্বাশুড়ীকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছি! কিন্তু কি করব, কান্না যে থামাতে পারছি না কিছুতেই! বুদ্ধিমতী আম্মু সাথে সাথে বুঝে গেলেন ঘটনা। আমার পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে শুনালেন নিজের বিবাহিত জীবনের একেবারে প্রথম দিকের কাহিনী, একেবারে ঠিক একই রকম পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন তিনি। আমাকে খুব আদর করে বলতে থাকলেন, প্রথম দিকে দু’জন দু’জনকে বুঝাবুঝির সময়ে এরকম হয়ই! সেই দিন আম্মু এত সুন্দর করে আমার লজ্জাটা ঢেকে দিয়েছিলেন আর আমি চোখ মুছে একটু ধাতস্থ হওয়ার পরেই সব কিছু এমন বেমালুম ভুলে যাওয়ার ভান করলেন যে আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ হয়েছিলাম! এই যে ভুল করে শিখার চান্স দেয়া, ছেলেমানুষী ভুলের কথা ভুলে যাওয়া—শুনেছি শ্বাশুড়ীরা নাকি ওসব পারে না?!

আম্মু ফর্সা মানুষ, লম্বায় পাঁচ ফুট পাঁচ, ঘন কালো চুল কিছুটা হারিয়েছেন সময়ের আবর্তে, তবু যা আছে তাতে বুঝা যায় এককালে মানুষের মাথা ঘুরাতেন। এই মানুষটাই বা আমাকে কেন প্রথম দেখাতেই পছন্দ করলেন?! তাও তাঁর “লম্বা-ফর্সা” ছেলের জন্য?! আমার অভিজ্ঞতায় সুন্দরী শ্বাশুড়ীদেরকে সৌন্দর্য দিয়ে মন ভরানো যায় না, অনেক বেছে বেছে বিয়ে দিয়েও তারা ভিতরে খুঁতখুঁতি নিয়ে থাকেন, আর আমি তো কালো মেয়ে, অতো লম্বাও না! কাহিনী বুঝলাম আম্মু যখন দেবরের জন্য বউ খুঁজছেন তখন। মহা সুন্দরী খুঁজেন নি তিনি, তিনি খুঁজেছেন এমন একজনকে যার হাসি দেখে ’আপন’ মনে হবে, মনে হবে একে ’মেয়ে’ বানানো যায়!

আমি ভেবে দেখলাম, আখিরাতে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে এই মানুষটা সম্পর্কে বলার মত এক বিন্দু খারাপ কিছু খুঁজে পাবো না আমি! কিন্তু এত দিন শ্বশুড়বাড়ি ছিলাম, কখনই কি একটুও মন খারাপ হয় নি? হয়েছে ঠিকই, কিন্তু একবারও তার জন্য আম্মুর অন্যায় আচরণ বা অভদ্রতা দায়ী ছিল না। বরং আম্মু যখনই বুদ্ধিমতী চোখগুলো দিয়ে বুঝেছেন আমার মুখের উপর কালো ছায়া পড়েছে, তখনই কিভাবে কিভাবে যেন সব মন খারাপ দূর করার ব্যবস্থা করে ফেলেছেন।

আমার অভিজ্ঞতা বলে, যারা খুব মিষ্টভাষী আর সুন্দর আচরণের হন, তারা অনেক সময়ই ব্যক্তিগত জীবনে কাজকর্মে অপটু হন, নিজেদের অক্ষমতার জন্যই অন্যদের অপটুতা ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখতে পারেন। কিন্তু আমার আম্মুর মত কর্মঠ আর নিপুণ মানুষ আমি খুব কমই দেখেছি! সেই ফজরের পর থেকে দেখি আম্মুর খুটখুট কাজ শুরু হয়ে যায়, রাতে কখনও দেখি নি আমাদের আগে ঘুমাতে যেতে। প্রতিদিন চাকরিতে যাওয়ার আগে পরে রান্নায় সময় দেন অনেক, বাসায় কেউ ব্লাড প্রেসারের রোগী, কারো ডায়াবেটিস, আবার কেউ ঝাল খেতে পারে না। দিব্যি দেখি তিনি সবার জন্য আলাদা করে সবার পছন্দের খাবার রান্না করে যাচ্ছেন! এতসব কাজ তিনি একাই করেন, আমাদের রান্নাঘরে থাকতে দেন না বেশিক্ষন, অভ্যাস নাই, কষ্ট হবে, এসব ছুঁতায় অন্য কাজে পাঠিয়ে দেন। আমরা ঠাট্টা করে বলি, আমরা শ্বশুড়বাড়িতে হলিডে কাটাই যাই, কারণ বাপের বাড়িতে এর চেয়ে অনেক বেশি কাজ করতে হয়!

ক্লাস নাইনে পড়া অবস্থায় বিয়ে করেছেন আম্মু, প্রথম সন্তান পেটে নিয়ে এসএসসি দিলেন, সেই শুরু। চারটা সন্তান কোলে পিঠে নিয়ে সবটুকু পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরিতে ঢুকলেন, চাকরির পাশাপাশি ছেলেমেয়ে মানুষ করলেন দারুণ ভাবে। আম্মু যে শুধু ঘর সংসার আর চাকরি করেছেন তা কিন্তু না, সমস্ত পাড়ার মানুষেরা দেখি আম্মুকে চিনে। মানুষের যে কোন প্রয়োজনেই আম্মু ছুটে যান, দুই হাত ঢেলে মানুষকে দিয়ে যান। অথচ কোন বিরক্তি নেই, কাজের মেয়েটার সাথেও দেখি সব সময় আদর মাখা গলায় কথা বলেন। এই যে এত অল্প বয়সে বিয়ে করেছেন তিনি, ঢাকায় বড় হয়েও বিয়ের পরে গ্রামে বেশ কয়েক বছর থাকলেন, আস্তে আস্তে সংসার, পড়াশোনা, সবই করলেন... জীবনে কষ্ট তো কম করেন নি। মানুষ নাকি নিজে কষ্ট করলে অন্যদের সহজে কিছু পেতে দেখা সহ্য করতে পারে না, কিন্তু আম্মু এমন হলেন কি করে? জীবন সম্পর্কে এত পজিটিভ থাকার শক্তি তিনি কোথায় পান? আম্মু বলেন তাঁর শ্বাশুড়ী খুব ভালো ছিল। কিন্তু সেই ভালো শ্বাশুড়ীর পুত্রবধু তো একাধিক, কিন্তু কই, আর কেউই তো আম্মুর মত না! আম্মু কখনও কোন ’ইসলামী প্রোগ্রামে’ বসেন না, তালিমে বসেন না, অর্থসহ কুরআনের বাইরে অনেক বেশি পড়াশোনাও করেন না। কিন্তু তারপরেও আল্লাহর উপর আম্মুর অপরিসীম ভরসা আর তাঁর নিজের অফুরন্ত মানবিক গুণাবলীগুলোর উৎস কোথায়? কত শিক্ষিত মানুষকে আর গাদা গাদা ইসলামী বই পড়া মানুষকে দেখলাম, সব শিক্ষা ভেসে যায় পুত্রবধু এলে!

অনেক ভেবে বুঝলাম, আম্মু আসলে ’মানুষ’ হিসেবেই ভালো। এই ভালো মানুষ হওয়াটা একদিনের কাজ না, সারা জীবনের কাজ। তিনি সারা জীবন অন্য সবার উপর যেই বুদ্ধিমত্তার চর্চা করে এসেছেন, মায়া দেখিয়েছেন আর ভালো মানুষী করেছেন, সেই ট্রেইনিংগুলোই কাজে লাগছে ভালো শ্বাশুড়ী হওয়ার জন্য। এই যে তিনি কখনও গীবত করেন না, সামনা সামনিও মানুষের ভুলের কথা বলেন না, কখনও কারোও কোন অতীত ভুল দ্বিতীয়বার উচ্চারণ করেন না, সব কিছুতেই ’ভালো কিছু’ খুঁজে পান আর সীমাহীন ভাবে ক্ষমা করতে পারেন, এ-সব কিছু তিনি সারা জীবন করে এসেছেন সবার সাথেই, ছেলে বিয়ে দিয়ে হুট করে বউদের সাথে শুরু করেন নি।

তাই বলি কি, যাদের এখনও বিয়ে হয় নি, তারা ভালো স্বামীর জন্য যেমন দোআ করবেন, ভালো শ্বাশুড়ীর জন্যও দোআ করতে ভুলবেন না কিন্তু! আর যারা শ্বাশুড়ীদের নিয়ে কষ্টে আছেন, তারা হয়তো শ্বাশুড়ীর আচরণের কারণগুলো বুঝতে শিখে নিজের কষ্ট কমাতে পারবেন, কিন্তু তাঁদের ব্যবহার বদলাতে পারবেন না পুরাপুরি। তাই পুত্রবধু হিসেবে পুরাপুরি শান্তি না পেলেও, যদি চেষ্টা করতে থাকেন নিজেকে একজন বিশুদ্ধ ভালো মানুষ হিসেবে দাঁড় করাতে, তাহলে হয়তো এক কালে ভালো শ্বাশুড়ী হতে পারবেন আর এই শ্বাশুড়ী-বউয়ের ঠুকাঠুকির কুৎসিত চক্রটা ভাংতে পারবেন! তাতে কিন্তু তৃপ্তি বেশি বই কম হবে না! এই যে আম্মু আমাকে দুই হাত ভরে দিতে থাকেন, আমি কি তখন আর কার্পন্য করে পারি? আম্মুর সান্নিধ্যে টের পাই নিজের ভিতরের সংকীর্ণতাগুলো একটু একটু করে জট ছাড়াচ্ছে। তাই আমার খুব ইচ্ছা করে আম্মুর সান্নিধ্য পেতে, ভালো মানুষের সান্নিধ্যেও কত শান্তি! আম্মুকে ছেড়ে আসার সময় আম্মু যখন নি:শব্দে চোখের পানি ফেলতে থাকেন আর বার বার বলতে থাকেন, ’স্বপ্নের মত আসলা আর গেলা...’ তখন বুকের ভিতরটা হু হু করে উঠে, জড়িয়ে ধরে গালে চুমু দেই। দূর থেকে সপ্তাহে কয়েক দিন কথা না বললে নিজেরই ভালো লাগে না। দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে আম্মুর জন্য চাওয়ার সময় সবটুকু আন্তরিকতা চলে আসে। শ্বাশুড়ী থেকে যে তিনি এত ভালোবাসার ’আম্মু’ হয়ে গেলেন, এ-ও কি তাঁর কম পাওয়া?

(পোস্টের অনুপ্রেরণা: "দাম্পত্য – ৬" পোস্ট ও মন্তব্যগুলো।)

Friday, November 11, 2011

আমি “সতীত্ব বাঁচাতে” হিজাব পরি না

নিজের ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য আমি হিজাব পরি না। ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য আমি মার্শাল আর্টস ক্লাস করেছি। ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য আমি কোন সময়ে এবং কোন জায়গায় গেলে বিপদে পরতে পারি তা বুঝে শুনে সেই সময়ে সেই জায়গাগুলো এড়িয়ে চলি।

আমি মাছি তাড়াতে হিজাব পরি না, কারণ জানি ইসলামে ’সস্তা’, ’সতীত্ব’ বলে কোন ’অ্যাবসুলুট কনসেপ্ট’ নেই। আগে দুই বার বিবাহিতা নারী খাদীজাকে নিয়েও তাই ইসলামের নবী মুহাম্মদ সুখী ছিলেন, পুরা যৌবনটুকুই কাটিয়ে দিয়েছিলেন এমন এক নারীকে নিয়ে, যিনি আগে একজন নয়, বরং দুই জন পুরুষের আটপৌরে স্ত্রী ছিলেন। যারা নারীদের মুক্তার মত দেখতে চায়, চির-অস্পর্শিত, চির-অদর্শিত, তাদের কাছে খাদীজা মূল্যহীন, সস্তা, সেই খাদীজা, যিনি মুহাম্মদ (সা) কে পুরা যৌবনে (পঁচিশ থেকে পঞ্চাশ) সুখী রেখেছিলেন, মৃত্যুর পরেও বার বার চলে আসতেন তাঁর আলোচনায়। আমি জানি ইসলামে অতীতকে বদলে ফেলা যায় বর্তমান দিয়ে, সে জন্যই ’সতীত্ব’ আর দামী হওয়ার কোন অ্যাবসুলুট কনসেপ্ট নেই ইসলামে।

আমি মনে করি একটা মেয়ে যত খোলাখোলি ভাবেই চলুক, তার উপর আক্রমন করা পুরুষটার দোষ পুরুষটারই। আমি কৃতজ্ঞ যে আমার জীবনের পুরুষেরা, আমার স্বামী, ভাই, বাবাও তাই মনে করে। যদি কখনও কোন ছেলের মা হই, তাহলে আশা করি সেও এভাবে ভাবতে শিখবে। মিশরে তাহরীর স্কয়ারে যখন পশ্চিমা নিউজ রিপোর্টার লারা লোগানের উপর হায়েনার মত ঝাপিয়ে পড়েছিল আশে পাশের পুরুষেরা, সবার সামনেই ধর্ষণ করছিল ওকে, তাদের দোহাই তো ছিল এটাই, মেয়েটাই তো ওর টাইট জিন্স দিয়ে উদ্বুদ্ধ করছে! ও তো চাচ্ছিল! আমি, আর আমার জীবনের পুরুষরা থাকতে চাই সেই ’কালো বোরখা’ পরা মেয়েদের আর তার পুরুষ সাথীদের মধ্যে যারা লারা লোগানকে বের করে এনেছিল হায়েনাদের থেকে। আমি যেভাবে ইসলাম শিখেছি, তাতে আমি জানি, লোভ চারিদিকে থাকবেই, একে বলা হয় ’পরীক্ষা’। আর পরীক্ষায় পাশ করার দায়িত্ব এক একজন ব্যক্তির, যার মাধ্যমে সে পরীক্ষায় পড়ছে সে না। যে ’পরীক্ষা’ তার হিসাব সম্পূর্ণ আলাদা। স্বয়ং শয়তানকে দোষ দিয়েও পার পাবে না আখিরাতে কেউ!

হিজাবের জন্য বহুল ব্যবহৃত কিছু যুক্তি এগুলো:-

“- কলা আল্লাহ প্যাকেট করে দিয়েছেন, চকলেটও ফ্যাক্টরি থেকে প্যাকেট হয়েই বের হয়, কিন্তু তাদের চেয়েও অমূল্য যে নারী, তাকে কীভাবে প্যাকেট না করার কথা ভাবি?

- যারা হিজাব করে না, তারা তো ইভটিজিং এর শিকার হবেই!

- একজন মেয়ে যদি নিজেকে সামলিয়ে চলতে না পারে, পুরুষকে প্রলুব্ধ করে, ঐ দুর্বল-কাতর মুমিন যদি নিজেকে সামলাতে না পারে - তাহলে কি সব দোষ ঐ পুরুষের? টাইট জিন্স আর ফতুয়া পড়া মেয়েটার কোনো দোষ নাই

- বোরখা না পরলে সমাজে অসামাজিক কার্যকলাপ বেড়ে যাবে।

- বোরখা একটি প্রতিরক্ষা বর্ম।“

কিন্তু এর একটা কারণেও আমি হিজাব পরি না।

আমি হিজাব পরি, কারণ আমি আল্লাহতে বিশ্বাস করি, আর আমি জানি হিজাব আল্লাহর নির্দেশ। আল্লাহর নির্দেশ আমি খুঁজে পাই কুরআন আর হাদীসে, কুরআনে সন্দিহান আর হাদীসে অবিশ্বাসকারী লেখকদের লেখায় না।

কুরআন হাদীসে আমি ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য কখনও হিজাবের ব্যবহার শুনি নি, বরং পেয়েছি শুধু হিজাব নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না!!! আয়েশার ব্যাপারে গুজব রটেছিল তিনি যখন নিকাবে মুখ ঢাকতেন তখন! হিজাব এবং নিকাব বিশুদ্ধতম নারীদের একজন, আয়েশাকেও ’সুরক্ষিত’ রাখতে পারে নি।


উমরের যুগে এক অবিবাহিতা মেয়ে যখন গর্ভবতী হয়ে পড়েছিল (সূত্র: ইবন কুদামাহ)তখন সে নিজেরআত্মপক্ষ সমর্থন করেছিল এভাবে: আমি গভীর ঘুমে ঘুমিয়ে ছিলাম, কে যে এসে কখন কি করেছে, আমি কিছুই টের পাই নি। উমর মেয়েটাকে নিরপরাধ ঘোষনা করে ছেড়ে দিয়েছিলেন। চোদ্দশ বছর পরে বাংলাদেশের সেক্যুলার আইনজীবিরাও এমন কথা বলা কোন মেয়েকে ’ধর্ষিতা’ অর্থ্যাৎ নির্যাতিতা ঘোষনা করবেন এক কথায়, তা আমি বিশ্বাস করি না! কারণ আমাদের যুগে, পশ্চিমে এবং প্রাচ্যে, ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায় পুরাপুরিই মেয়েদের, ছেলেদের না!

ইসলামে যে হিজাব ’ব্যক্তিগত সুরক্ষার’ নিশ্চিত করার জন্য না সেটা বুঝা যায় আমাদের নামাজের পোশাক দেখে। একান্তই নিজের ঘরে একাকী নামাজ পড়ার সময় শুধু আল্লাহর উপস্থিতি, ধর্ষক “পুরুষদের” অনুপস্থিতিতেও মাথা ঢেকে, গায়ে ঢিলা জামা গলিয়ে নামাজ পড়তে হয়! এর ব্যাখ্যা কি চকলেটের চোকলা লজিক দিয়ে করা যাবে?

আমার কাছে কলার চোকলা, চকলেটের খোসা, খোলা খাবার আর ঢাকা খাবার, এসব উদাহরণ বিচ্ছিরি এবং অশ্লীল লাগে। যারা হিজাবের সপক্ষে এই সব যুক্তি দেয়, তাদের উর্বর মস্তিষ্ক খাটাতে বন্ধ করতে দোহাই দেই। এমন উদাহরণ কি কুরআনে আছে? হাদীসে আছে? কিন্তু হাদীসে আর কি আছে আপনাদের শোনাই, হাদীসে আছে, আমাদের নবী মুহাম্মদ সাধারনত কারও সামনে বুকের জামা সরাতেন না, স্কলাররা বলেন, তিনি মাথাও ঢেকে রাখতেন বেশির ভাগ সময়ে। রাসুল আরও বলেছেন, ’লজ্জা ঈমানের অর্ধেক (বুখারী)’ (নারীর ভূষণ না!)। খোলা খাবারের উদাহরণ দিয়ে আমরা নারীকূলও তাহলে পুরুষদের দোহাই দেয়া শুরু করি, রোমশ বুক ঢেকে রাখুন প্লীজ, মাথা ঢেকে রাখুন দোহাই লাগে, খোসা ছাড়া কলায় আকর্ষন কমে যায়, মাছি বসে! হাজার হোক, হাদীসের কনসেপচুয়াল ব্যাক আপ তো আছেই আমাদের... (এটা আমার কাছে আশ্চর্য লাগে, পুরুষদের জন্য ঢিলা পোশাক, মাথায় টুপি, ধর্মীয় নিদর্শন ধরে নেওয়া হলেও নারীদের ক্ষেত্রে কেন এই কলার খোসার কনসেপ্ট চালু করার দরকার হলো!)

শুকর না খাওয়ার অনেক পার্থিব গুণ থাকতেই পারে, কিন্তু আমার কাছে হালাল খাবার খাওয়ার জন্য সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ না। আমার জন্য শুধু এতটুকু জানাই যথেষ্ট যে এটা আল্লাহর নির্দেশ। তবে আমি এও জানি যে আল্লাহর নির্দেশের পার্থিব গুণ থাকে সাধারণত! কিন্তু সেই পার্থিব গুণগুলো আমার জন্য নির্দেশ পালনের ’মূল কারণ’ না। পার্থিব গুণগুলো শুনে হয়তো খুশি হই, আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি, কিন্তু এতটুকুই! মদ নিষেধ করার সময় আল্লাহ বলেছেন, “তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করছেঃ মদ ও জুয়ার ব্যাপারে নির্দেশ কি? বলে দাওঃ ঐ দুটির মধ্যে বিরাট ক্ষতিকর বিষয় রয়েছে যদিও লোকদের জন্য তাতে কিছুটা উপকারিতাও আছে, কিন্তু তাদের উপকারিতার চেয়ে ক্ষতি অনেক বেশী” (২:২১৯)

আল্লাহ নিজে স্বীকার করছেন মদ আর জুয়ায় ’উপকারিতা’ আছে, কিন্তু তারপরেও সেগুলো ’হারাম’! আমরা যারা আল্লাহতে বিশ্বাস করি, তাদের এই বিশ্বাস জন্মানো উচিত যে উপকারিতা আর ক্ষতির হিসাব আল্লাহই সবচেয়ে ভালো করতে পারবেন। যারা বলতে চান ’হিজাব নারীমুক্তির একমাত্র গ্যারান্টি’, ’হিজাব পড়লে সমাজে শান্তি বজায় থাকবে’, ’হিজাব পড়লে নারী মুক্তার মত ঝকঝকে থাকবে’, তাদের এই কথাগুলো কেউ যদি নিজের ব্যক্তিগত জীবনে ভুল প্রমান করতে পারে, তাহলে কি হিজাব তাদের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যাবে? তা তো না! যত যা কিছুই হোক, এখানে তো আমাদের জন্য ’তালগাছ আল্লাহর’, যত পার্থিব যুক্তিই হোক, সেসবের উর্ধ্বে কেবল আল্লাহর নির্দেশ! তাহলে প্রথমেই সে কথা বলো না রে বাপু!

হিজাব হয়তো আমাকে পার্থিব কিছু সুবিধা দেয়, সে অস্ট্রেলিয়ার তীক্ষ্ম রোদ থেকে রক্ষাই হোক, মানুষের চোখে সম্মানিত থাকাই হোক। হিজাব আমাকে কিছু পার্থিব অসুবিধাও দেয়, প্রচন্ড গরমে হিজাব পড়াটা খুব স্বস্তিকর না, মানুষের মনে হিজাব সম্পর্কে অনেক অনেক প্রেজুডিস, বাংলাদেশে ’মোল্লা’ আর এখানে ’ফান্ডামেন্টালিস্ট’। কিন্তু আমি তো ’লাভ ক্ষতির’ হিসাব পার্থিব হিসাবে করছি না। আমার হিসাব এতটুকুই, হিজাব আল্লাহর নির্দেশ। বাড়তি যা কিছু পাই, তা আমার অতিরিক্ত পাওনা।

Saturday, July 30, 2011

কুড়িয়ে নেয়ার সময়

ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি রমজান হচ্ছে নিজেকে গড়ার সময়। সেদিন মসজিদ টরেন্টোতে খোতবা শুনতে গিয়ে চমকে উঠলাম। ইমাম বলছেন, রমজান নিজেকে গড়ার নয়, বরং অনেক কিছু কুড়িয়ে নেয়ার সময়।

একটা কাজের জন্য যখন বহুগুণ প্রতিদান পাওয়া যায়, আবশ্যিক কাজের জন্য সত্তর গুণ প্রতিদান, ঐচ্ছিক কাজের জন্য আবশ্যিক কাজের প্রতিদান, তখন "কুড়িয়ে" নেয়ার সময়ই বটে!

রোজার প্রস্তুতি হিসেবেই শোনা শুরু করেছিলাম নোমান আলির কথাগুলো শুনতে শুনতে নিজের ভিতর "কুড়িয়ে" নেয়ার তীব্র ইচ্ছা হলো, মনে হলো কত কি মিস হয়ে যাচ্ছে... বলছিলেন নোমান আলি সূরা বাকারায় (১) আল্লাহ স্বামী স্ত্রীকে একে অপরের পরিচ্ছেদ বলেছেন। বাক্যাংশটা বহু শুনেছি, যখনই ইসলামে বিয়ের মূল্য নিয়ে পড়ি বা শুনি, এই বাক্যাংশটা থাকেই। কিন্তু কখনও কোথাও পড়ি নি যে এই বাক্যাংশটা আসলে রোজার আয়াতের একটা অংশ! বলছিলেন নোমান আলি, রোজার আয়াতেরই অংশ, কারণ রমজানে "কুড়িয়ে" নেয়াতে সাহায্য করবে স্বামী স্ত্রী, একে অপরকে, পরিচ্ছেদ হয়ে "বাঁচিয়ে" দিবে।

শুধু স্বামী স্ত্রীই না আসলে, ইদানিং খুব মনে হয়, খুব কাছের বন্ধুদের তো তাই করা উচিত... বাঙালী মায়েরা ছেলেমেয়েদের মুখে একটা দানা বেশি পুরতে পারলে কি খুশি হয়, সন্তানদের ছোটখাট শখ পূরণ না করতে পারলে কি অপরাধবোধে ভোগেন। কিন্তু এরচেয়েও বেশি যেটা দরকার, খুব বেশিই দরকার, সেই প্রয়োজনটুকু মিটাতে মায়েদের, বা প্রিয় মানুষদের সেরকম আকুলতা নেই।

অথচ ওই যে, তারাবীর নামাজ পড়া শুরু করলে প্রথম প্রথম জোশ থাকে খুব, তারপরে আট রাকাত পার হতেই সব গোলমেলে মনে হতে থাকে, সালাম ফিরাতেই জিজ্ঞাসা করতে হয়, কত রাকাত হলো? কিংবা ক্লাসে অথবা চাকরিতে গিয়ে ঘুমে ঢুলে পড়তে হয়, সারাক্ষন বড় ক্লান্ত লাগে, সবার করুনা পাওয়া নিজের অধিকার মনে হয়, অথচ, রোজা ফরজ করেই আল্লাহ বলছেন এভাবে আমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারতেও পারি (২), আর আল্লাহ আমাদের জন্য কোন কষ্ট চান না (৩)! এটা কষ্ট না? এটাই বুঝি তাকওয়া!

বুঝালেন নোমান আলি, আমাদের শরীরি অস্তিত্বকে শুধু উপবাস করালেই হয় না, শরীরের ভিতরেও যে অস্তিত্ব, যা আমাদের পশু থেকে আলাদা করে, উন্নত করে, লিম্বিক সিস্টেমের উর্ধ্বে উঠার সুযোগ দেয়, সেই অস্তিত্বেরও প্রয়োজন আছে, তাকে খাওয়াতে হয়। আর তার খাবার হচ্ছে কুরআন।

সে জন্য কুরআনের মাসে কুরআন পড়তে হবে, বুঝতে হবে। সময় নিতে হবে, ভাবতে হবে... কিন্তু রোজার দিনগুলোতে নয়টা পাঁচটা কাজ করে এসে, ইফতার করে, তারাবী পড়ে, খুব কম ঘুমিয়ে, আসলে এই জিনিসটাই হয় না, "ভাবা"।

কুরআন পড়তে গেলে মনে হয়, কিন্তু এই ধরণেরই কি যেন পড়লাম না গত সপ্তাহে? গতানুগতিকতা চলে আসা মানেই তো বিরক্তি।

নোমান আলির কথায় যখন কুরআনের তিরিশ পারার ব্যাখ্যা শোনা শুরু করলাম পিএইচডির কাজ করতে করতে, ভেবেছিলাম, সেই তো একই কথা হবে, ব্যাকগ্রাউন্ডে শুনতে থাকি, নিজের কাজও করতে পারব। কিসের কি, কিছুক্ষন পরে পূর্ণ মনযোগ দিতে বাধ্য হলাম! নোমান আলি যখন ব্যাখ্যা করেন শব্দমূল সহ, তাঁর আরবি সাহিত্যের সুগভীর জ্ঞান দিয়ে বুঝিয়ে দেন, কাছাকাছি আরও অনেক শব্দ থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ ঠিক কেন এই শব্দটাই ব্যবহার করেছেন, কিভাবে আর দশ সূরা আগের তিন নাম্বার আয়াতের থেকে এই আয়াতটা পুরাপুরি আলাদা, তখন হঠাৎ বুঝতে পারি নতুন করে, কুরআনের পাতায় পাতায় কত গল্প। এ পর্যন্ত নোমান আলি তিরিশ পারার পুরাটুকুই আর সূরা বাকারার অর্ধেকের কিছু বেশি ব্যাখ্যা করেছেন, আসলেই উপভোগ্য, রম্য-অর্থে না, নিজের জানাকে ভীষণ ভাবে চ্যালেঞ্জ করে সেই অর্থে।

ইয়াহিয়া ইবরাহীম আমার ভীষণ প্রিয় আরেকজন ব্যক্তিত্ব। মিশরীয় পরিবারের, কানাডায় বড় হওয়া, অস্ট্রেলিয়ায় বিয়ে করে আপাতত সেখানেই থাকছেন। ভাষাগত বিশেষ মেধা থাকবে বলেই হয়তো, একটা আয়াত বলেই এত সুন্দর সব শব্দ দিয়ে মুখে মুখে সেটার অনুবাদ করেন, যে ভীষণ মুদ্ধ না হয়ে পারি না। এক একজন মানুষের আন্তরিকতা ভীষণ ছুঁয়ে যায়। কথাগুলো যে শুধু থিওরী না, নিজের জীবনে পুরাপুরি বাস্তবতা, সেটা বুঝা যায়। কানাডায় আসার আগে যখন উদ্ভ্রান্ত হয়ে থাকার জায়গা খুঁজছি তখন ইয়াহিয়া ইবরাহিমের মত ভীষণ ব্যস্ত মানুষটাও, অজানা অচেনা আমার সামান্য ইমেইলে সাড়া দিয়ে সাহায্য করার অনেক চেষ্টা করলেন।

কিছুদিন আগে যখন ইয়াহিয়া ইবরাহীমের রোজা নিয়ে বক্তব্যটা পেলাম, খুব ভালো লাগল।

আর সবশেষ গত বছরের মত এবারেও মিফরাহর কল্যাণ ছড়িয়ে দেই, মিফরার দেয়া একটা লিংক, যারা উপকার নিতে চান, তারা অনেক উপকার নিতে পারবেন এখান থেকে।

শেষ করছি ২০১০ সালে রমজানের আগে লেখা "বছরের সেরা সময়গুলো আসছে আবারও..." এর লিংক দিয়ে। কে জানে, কে কোথা থেকে কি কুড়িয়ে নিতে পারে নিজের ঝোলায়?


-------
১. সূরা বাকারা: ১৮৭
২. সূরা বাকারা: ১৮৩
৩. সূরা বাকারা: ১৮৫

Saturday, April 30, 2011

হৃদয়ের পথে ১২: পার্থিব ব্যাপার স্যাপার

মক্কা, মদীনা দুটো শহরেই, হোটেল থেকে আমাদের সকালের নাস্তা দিত। বুফে খাবার, এশিয়ান, আরব, পশ্চিমা, সব ধরণের নাস্তাই থাকতো, বেশ আয়েশ করে পেট ভরে খেতাম আলহামদুলিল্লাহ। দুপুর আর রাতের খাবার ছিল আমাদের নিজেদের দায়িত্বে। হারাম থেকে বের হলে রাস্তার দুদিকেই প্রচুর খাবারের দোকান। একই শহরে যেখানে ২০-৩০ লাখ মানুষ এসে যায়, সেখানে স্বভাবতই দোকানে বসে খাওয়ার সুযোগ কম, খাবার হাতে নিয়ে হয় হারামের বাইরের চত্ত্বরে না হয় রাস্তার ফুটপাথে বসে খেতে হতো। সেভাবেই খেতে খেতে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই খেয়াল করলাম, রাস্তায় চিকেন আর মুরগী ছাড়া আর কিছু পাওয়া ভার! হয় মুরগী-পোলাও, মুরগী-রুটি, ঝোলওয়ালা মুরগী, আগুনে পোড়ানো মুরগী, চিকেন শর্মা, চিকেন বার্গার...
এগুলোর বাইরে আছে খাসী আর গরুর গোশত! খাসী গরুর চেয়ে মুরগীটা আমার বেশি পছন্দ, কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই দুইবেলা চিকেন আর মুরগী ছাড়া কিছু না পেয়ে আমি রীতিমত হাঁপিয়ে উঠলাম! একে তো গোশত গোশত গোশত, তার উপর এত তেল আর মশলা! মক্কা, মদীনা, দুটো শহরের এক শহরেও আমি তেলছাড়া সাদা ভাত পেলাম না! সৌদিতে নিশ্চয়ই সাদা
ভাত খায় না! তখনই প্রথম টের পেলাম, আমার স্বাস্থ্য সচেতন মা আমাদের টেস্ট বাডকে চিরতরে বদলে দিয়েছেন! একটু
খানি সবজি, একটু খানি মাছের জন্য কেমন যে লাগত! তেল ছাড়া, মশলা ছাড়া, শুধু সবজি। বেশি করে লেবু চিবে লেবুর খোসাসহ একটু ডাল খেতে পারলে কি শান্তি লাগত! সিডনীতে ফিরে কয়েকদিন শুধু লেবু দিয়ে ডাল ভাত খেয়েছি আর প্রথম সুযোগেই সুশি খেয়েছি, তেল-মশলাহীন সুশি! আর ফল? ফল বলতে পাওয়া যেত খেঁজুর আর না হয় খুব শুকনা এক হালি কমলা, আপেল, একটা দু'টা দাগওয়ালা কলা। দাম ছিল ভয়াবহ বেশি। মরুভূমির দেশ, খাবারের মেন্যুই তাই পুরাপুরি অন্যরকম। আস্তে আস্তে আমরা দুটো খাবার আবিষ্কার করলাম। প্রথমটা হচ্ছে, “মক্কা টাওয়ারের” (১১ নম্বর পোস্ট দ্রষ্টব্য... ওই যে, বড়, সবুজ, কুৎসিত ঘড়িওয়ালা বিল্ডিংটা, যা কিনা ইসলামিক গ্রীনিচ :(!) নিচে, “আস সাফা শপিং সেন্টারের” ফুড কোর্টের মালয় দোকানটা! ওখানে সাদা ভাত আর পালং শাকের ঝোল পাওয়া যেত, খুব কম মশলা দিয়ে পাতলা করে রান্না করা পালং শাকের ঝোল। খেয়ে এত তৃপ্তি হতো! আর দুই নম্বর হচ্ছে, লাবান আর চিড়া! লাবান অর্থ্যাৎ দই।

ছবির ঠিক এই ব্র্যান্ডের লাবান পাওয়া যেত প্রায় প্রতিটা দোকানেই। অসম্ভব মজা। একটুখানি লবন মিশিয়ে নিলে আরও মজা হয় (লবন পেতে অনেক ঝামেলা করতে হয়েছে, দোকানে দোকানে ঘুরতে হয়েছে, তাই যাদের লবন কমে সমস্যা হয়, তাদের সামান্য লবন নিয়ে যাওয়া ভালো...)। আর চিড়া ঘটনা হচ্ছে, আমরা হজে যাচ্ছি বলে আম্মু, আমার শ্বাশুড়ি, ঢাকা থেকে কাকে কাকে ধরে অনেকগুলো চিড়া পাঠিয়ে দিয়েছেন, যদি আর কোন খাবার না পাই তাহলে অন্তত: চিড়া চিবিয়ে যেন বেঁচে থাকতে পারি। প্রথমে আমরা দুজনেই হেসে ফেলেছিলাম, কিন্তু যখন মুরগী নিয়ে সিরিয়াস বিরক্ত, তখন একদিন চিড়া ভিজিয়ে লাবান আর লবন দিয়ে খেয়ে কি যে শান্তি লাগল! আস্তে আস্তে সেখানে ভ্যারাইটি যোগ হলো, একটা কলা কিংবা কয়েকটা খেঁজুর! একজন ডায়বেটিকস রুগীর সাথে পরিচিত হওয়ার পরে ওনাকে চিড়াগুলো দিয়ে দিলাম, বেচারার চিড়া শেষ হয়ে যাওয়ায় খুব কষ্টে ছিলেন। তখন এক রিয়ালের নরম বনরুটি আবিষ্কার করলাম, তেল মশলা থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে ওই বান, কলা আর লাবান আমরা খুব মজা করে খেতাম! মাত্র দুই রিয়েলে অসম্ভব তৃপ্তিদায়ক খাবার!

মদীনায় যাওয়ার পরে আবার মালয়শিয়ান দোকানটা মিস করছিলাম! তখন একটা আরব দোকানে গিয়ে সবজি খুঁজতে খুঁজতে লিস্টে একটা সবজি-তরকারি পেয়ে দোকানওয়ালাকে দিতে বললাম। দোকানওয়ালা বাঙালী ছিলেন, ওই তরকারি উনি দিতে চান না। আমরা নাকি খেতে পারব না! জোর করে দিতে বললাম, উনি মাথা নাড়তে নাড়তে দিলেন। খেয়ে মনে হলো ভাগ্যিশ নিয়েছিলাম! ঝোলওয়ালা ঢেড়শের তরকারী, রুটি দিয়ে ভিজিয়ে খেতে বেশ লাগল, মুরগীর চেয়ে হাজার গুণ ভালো! এই তরকারিটা মোটামোটি সব আরব দোকানেই পাওয়া যায়।

মক্কায় শুনেছি “মিসফালায়” প্রচুর বাঙালী খাবারের দোকান। কিন্তু সব সময় নামাজের পরে ওই দিকটায় অনেক ভিড় থাকতো। এত ভিড় ঠেলে খেয়ে আসতে যেই সময় আর এনার্জি লাগত, সেটাকে গ্রহনযোগ্য মনে হয় নি! তবে মদীনায় একবারই প্রায় আধা ঘন্টা হেঁটে খেয়ে এসেছিলাম বাঙালী দোকানে, একজন বাঙালী ভাই খাইয়েছিলেন খুব যত্ন করে। রুই মাছটা ভালো লেগেছিল, ডাল খেলাম শখ করে, কিন্তু ততদিনে আসলে মশলা আর তেলে খুব বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলাম, আর হোটেলের খাবারে যা হয়, প্রচুর তেল আর মশলা!

আর আল বাইকের কথা তো বলতেই হবে। আল বাইক ম্যাকডোনালডস আর কেএফসির মত, ফাস্ট ফুডের দোকান, কিন্তু সৌদির নিজেস্ব ব্র্যান্ড বলে বেশ সস্তা। এগারো রিয়েলে আমাদের দুজনের ভরপেটে খাওয়া হয়ে যেত, খাবারগুলো বেশ মজাও ছিল। কিন্তু ওই পুরানো সমস্যা, আল বাইকে যেতে অনেক হাঁটতে হতো, মক্কা মদীনায় ঘুরতে গেলে এক কথা, কিন্তু উদ্দেশ্যই যখন যতটা সম্ভব মসজিদে সময় কাটানো, তাই দু'বারের বেশি খাই নি ওখানে।

আমাদের সাথে মা কিছু শুকনা বাদাম আর কিসমিস এক সাথে মিশিয়ে দিয়েছিল। এটা সব সময় ব্যাগে রাখতাম। হঠাৎ খিদা লেগে গেলে একটু কিসমিস বাদাম খেয়ে জমজম খেয়ে নিলেই আবার শরীরে আর মনে বল ফিরে আসত! মাঝে মাঝে আশে পাশের মানুষদের দিলেও অনেকে খুব খুশি হতো, হয়তো খিদে পেয়েছে, কিন্তু জায়গা ছেড়ে বের হতে চাচ্ছে না। এই ব্যাপারটা আমার খুব ভালো লাগত। পশ্চিমে বড় পারসোনাল স্পেইসের কারণে মানুষকে নিজের হাতের মুঠোয় ধরে বাদাম আর কিসমিস সাধা যায় না বা পাশের অচেনা বুড়িটার হাতটা টেনে নিয়ে তাতে কিছু বাদাম গুঁজে দিলে লাজুক লাজুক সুন্দর হাসিটা দেখতে পাওয়া যায় না! এটা আমি করতে পারতাম না তেমন, কি না কি ভাবে ভেবে অনেক সময় তটস্ত থাকতাম, কিন্তু নও কি অবলীলায় বিতরন করে বুড়ি বুড়ি মহিলাগুলোর মুখে ফোকলা হাসি ফুটিয়ে যেত!

মাঝে মাঝে (সর্বমোট তিন/চার দিন হয়েছে হয়তো) দিনের শেষে পা বেশ ভালোই ব্যাথা করতো। তখন রুমে
ফিরে, হট শাওয়ার নিয়ে, পেশীর ব্যাথার জন্য কেমিস্ট থেকে প্রেসক্রিপশন ছাড়া কিনতে পাওয়া যায় এমন জেল লাগিয়ে শুয়ে পড়তাম। চার ঘন্টার ঘুমেই ব্যাথা আর ক্লান্তির লেশ মাত্র থাকত না।

কিসমিস বাদাম, এক বোতল পানি আর নিজের স্যান্ডেল রাখার জন্য সাথে ছোট্ট একটা ব্যাগ রাখতাম সব সময়। স্যান্ডেল হয়তো চুরি হয় না, কিন্তু ওই যে, লাখ লাখ মানুষ বলে কথা! কাবা কর্তৃপক্ষ নিজেই টাঙিয়ে দিয়েছেন নিচের নোটিশ:

ক্যামেরার ব্যাপারে এক সময় খুব রেস্ট্রিকশন ছিল, এখন আস্তে আস্তে বেশ শিথিল হয়ে এসেছে। শেইখ উথাইমিনের (যারা জানেন না তাদের জন্য: শেখ উথাইমিন সালাফী স্কলার, সৌদি কর্তৃপক্ষ মূলত সালাফী) মতে ক্যামেরায় ছবি তোলা আয়নায় নিজের চেহারা দেখার মতই, আঁকা ছবির চেয়ে আলাদা। সে জন্যই হয়তো। তবে ক্যামেরার সাইজ বেশি বড় হলে অবশ্য ঝামেলা হবে! তবে ক্যামেরা নিলে আবার অন্য রকম বিপদ হতে পারে...

উইটিউবে এরকম অনেক ভিডিও... পাবলিক তাওয়াফ করতে করতে ভিডিও করেছে! তাওয়াফের মধ্যে এমন করার অনুমতি আছে কিনা আমার জানা নেই, কিন্তু এই অবস্থায় তো মন লাগাতে পারার কথা না!

ঢুকার সময় ব্যাগ সার্চ হয় এবং ব্যাগ বেশি বড় হলে ভিতরে নেয়া যায় না, নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য। তাতে কি আর মানুষ ঠেকে? বিশ তিরিশ লাখ মানুষের মধ্যেও নিজের ব্যাগ খুঁজে পাওয়ার অভিনব ব্যবস্থা আবিষ্কার করেছে পাবলিক:


হৃদয়ের পথে ১১: হজ গ্রুপ আর রাস্তাঘাট

হজ গ্রুপ খুঁজতে নিয়ে মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। প্রচুর হজ গ্রুপ, একেক গ্রুপের স্পেশালিটি একেক রকম, কাদের সাথে যাবো? সাথে পুঁজি হিসেবে ছিল ইসমাইল ডেভিডস আর ভাইয়ার সাবধানতা: সাথী ভালো না হলে সেই খারাপ লাগাটা হজকেও স্পর্শ করে। ভয় পেতাম রিমার কথা ভেবে, যদি হজের মাঝখানে আমার সত্যি সত্যি মনে হওয়া শুরু হয় কখন বাসায় যাব!

হজগ্রুপগুলো তাদের ভিন্ন ভিন্ন স্পেশালিটির জন্যই বিশেষ কিছু ধরণের মানুষকে আকৃষ্ট করে। কেউ হয়তো ভাষাভিত্তিক দল নিয়ে যায়, আরবি ভাষী, বাংলাভাষী, উর্দুভাষী, তাতে যারা দ্বিতীয় কোন ভাষায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না, তারা খুব আরাম পায়। কেউ ইসলামের বিশেষ কোন মতের বিশেষ বিশ্বাসী, সালাফী, ইসলামী আন্দোলন বা দেওবন্দী, তারা সমমনা মানুষ পায়। আমাদের জন্য সেরকম শক্ত পছন্দ করার মত কোন হজগ্রুপ ছিল না, সেজন্যই সিদ্ধান্ত নিতে ঝামেলা হলো।

শেষ মেষ লাব্বাইকের সাথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম কয়েকটা কারণে:
১. খরচ—সিডনীর সস্তা গ্রুপগুলোর মধ্যে অন্যতম।

২. পাঁচশ হাজীর বিশাল বড় গ্রুপ, অন্তত: পাঁচ বছর ধরে সিডনী থেকে হাজীদের হজে নিয়ে যাচ্ছে। কারো থেকে খারাপ কিছু শুনি নি। অনেক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বলে মিসম্যানেজমেন্ট কম। এত বড় গ্রুপ নিয়ে যাচ্ছে বলে নিশ্চয় ডিসকাউন্ট পায়, তাই দাম অনুযায়ী বেশ ভালো সার্ভিস দিতে পারে।

৩. দিন-তারিখ আমাদের খুব ভালো ছিল। অনেক হজ গ্রুপ চল্লিশ দিনের জন্য নিয়ে যায়, কেউ বিশ দিনের জন্য নিয়ে যায়। আমাদের হজ গ্রুপটা ঠিক আঠাশ দিনের জন্য নিচ্ছিল। আমি চার সপ্তাহের বেশি ছুটি নিতে পারতাম না।

৫. হজ গ্রুপ নিয়ে যাওয়া তিনজন শেইখ সম্পর্কেই ভালো কথা শুনেছি অনেক। তিনজন ভিন্ন ভিন্ন দেশের। এত বড় গ্রুপ তাই হাজীদের মধ্যেও বিভিন্ন দেশী মানুষদের মিশ্রন হয়। ফলে ইংরেজি মূল ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

৬. দুরত্ব: মক্কার হোটেলটা থেকে মসজিদুল হারাম পনের মিনিটের হাঁটা, মদীনার হোটেল যদিও তিন তারা, কিন্তু রাস্তা পার হলেই মসজিদ।

৭. একই খরচে ভালো কিছু অপশন সহ একটা গ্রুপ হিলটন হোটেলে রাখার প্রতিজ্ঞা করছিল, কিন্তু সেখানে প্রতিটা রুমে ৬-৭ জন থাকবে! এত মানুষ এক সাথে থাকতে হলে একেকজনের একেক রুটিন, মতপার্থক্যের চিপায় পড়ে অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে। লাব্বাইক সর্বোচ্চ চারজনকে এক রুমে রাখে, তাতে সঙ্গীদের সাথে মত না মিললেও খুব বেশি ঝামেলা হওয়ার কথা না।

৮. বড় গ্রুপ বলে আসলে স্বাধীনতা প্রচুর। আগেই জানতাম, হজের দিনগুলো হজের মূল জিনিসগুলোতে ওরা সাহায্য করবে, কিন্তু তাছাড়া বেশির ভাগ জিনিসই নিজেদের সময় অনুযায়ী করতে হবে। তাতে হয়তো বয়স্ক মানুষদের বেশ সমস্যা হয়ে যেত, কিন্তু আমি আর নও, দুজনেই নিজেদের মত করে অভিজ্ঞতা পেতে পছন্দ করি, তাই এই ব্যাপারটা আমাদের পছন্দ হয়েছিল।

সিদ্ধান্তটা ভুল হয় নি একেবারেই, লাব্বাইক হজগ্রুপের ব্যাপারে আমার সত্যিই বিন্দুমাত্র অনুযোগ নেই, কি করে এত বিশাল একটা গ্রুপকে এত সুশৃঙ্খল ভাবে হজ করালেন, সেটা ভেবে আমি সঅবাক হই। একেবারে সত্যি সত্যি দোআ করতে ইচ্ছা হয় ওঁদের জন্য।

মক্কায় যাওয়ার আগে আমি গুগল ম্যাপে আমাদের হোটেল থেকে কাবার পথটুকু দেখে নিয়েছিলাম। ব্যাপারটা আমাদের খুবই কাজে লেগেছে! যদিও ওখানে গেলে সব এমনিতেই চেনা হয়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু এত মানুষের মধ্যে কনফিউশন কমানোর যদি পথ থাকে, তাহলে ক্ষতি কি?

সেটার কথা ভেবেই একটা ফটোশপ করে গুগলের ম্যাপে কিছু ট্যাগ বসালাম। পাঠকদের কতটুকু কাজে লাগবে জানি না, এই কাজটা করতে আমার ভালো লেগেছে, কারণ পুরা এলাকার একটা রিভিশন হয়ে গিয়েছে, আর পরে যদি কখনও যাই, তাহলে ইনশাআল্লাহ কাজে লাগবে।


মসজিদুল হারামে অনেকগুলো গেই, আশিটার মত হবে। চল্লিশ লাখ মানুষের ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন এই মসজিদে ঢুকার সময় কিছু ল্যান্ডমার্ক দরকার হয়, না হলে আর বের হতে হবে না!

আমি পাঁচ নম্বর গেইট/আজওয়াদ গেইট দিয়েই বেশির ভাগ সময়ে ঢুকতাম। বের হওয়ার সময়ও এদিক দিয়ে বের হতাম। আলাদা নামাজ পড়লে আমার আর নওয়ের মিলনস্থল থাকতো আজওয়াদ গেইটের সামনের ল্যাম্প পোস্টটা। ওখানে অবশ্যই আরও অনেকেরও মিলনস্থল থাকতো। কিন্তু সেখান থেকে খুঁজে পেতে সমস্যা হতো না। এক সাথে হোটেলে ফিরার ইচ্ছা থাকলে মসজিদের ভিতরে দেখা করতে চাওয়া বোকামি!

আজওয়াদ গেইটের কাছে দোতালা এবং তিন তালায় যাওয়ার জন্য সিঁড়ি, এলিভেটর এবং লিফট, তিনটাই আছে। কখনও নিচতালা ভরে গেলে চট করে দোতালা, কিংবা তারও উপরে উঠে যাওয়া যেত খুব সহজে। কখনও কখনও আবার একেবারে চারতালায় উঠে যেতাম! এমনিতে, মসজিদটা দোতালা, তাই তিনতালা মানেই ছাদ, কিন্তু সাফা আর মারওয়ার মাঝখানেরটুকুতে ভিড় এড়াতে ২০১১ তেই তৃতীয়তলা বানানো হয়েছে, ফলে শুধু ডান দিকে, সাফা মারওয়ার অংশটুকুতে ছাদটা চারতলায়। মানুষ হয় সেই চারতলা ছাদের কথা জানে না বা কোন কারণে সেই ছাদে যায় না, কারণ হজের ঠিক আগে পরে, হারাম যখন ভিড়ে টই টুম্বুর, তখনও দেখেছি সেই চতুর্থ তলার ছাদে মানুষ খুব কম!
আরেকটা জায়গায় একেবারে নামাজের পনের মিনিট আগে গিয়েও সব সময় জায়গা পেতাম, ম্যাপের বাঁ দিকে, “নতুন এসি এলাকার” দোতালায়। এমনিতে মসজিদুল হারাম পুরাটা এয়ারকন্ডিশনড না, কিন্তু এই অংশটা নতুন করা, তাই এসি আছে। এখানে নামাজ পড়তে হলে কাবা থেকে বেশ দূরে যেতে হয়, কাবা দেখা যায় না, সেজন্যই হয়তো জায়গাটার আকর্ষন কম। কিন্তু সত্যি বলতে কি, মাঝে মাঝে দুপুর বেলা প্রচন্ড রোদ থেকে এসে এয়ারকন্ডিশনড অংশটায় ঠান্ডা টাইলসে কপাল ঠেকিয়ে ঠেলা ধাক্কা ছাড়া নামাজ পড়তে এত শান্তি লাগত! আর “জায়গা পেতাম” বলতে কিন্তু আরামে বসার জায়গার কথা বলছি না, জমজম পানির কন্টেইনারগুলোর বা দেয়ালের আশ পাশ দিয়ে মানুষ একটু জায়গা রেখে বসতো, সেসব জায়গার কথা বলছি। শুকনা মানুষ বলে অল্প জায়গাতেই নিজেকে বসিয়ে ফেলতে পারতাম। নামাজের পনের মিনিট আগে অন্য জায়গায় সেরকম জায়গাটুকুও পাওয়া যায় না।

মসজিদের বেইজমেন্টে অবশ্য যে কোন সময়ে জায়গা পাওয়া যেত, কিন্তু ওখানে নামাজ পড়তে আমার এত বিরক্ত লাগত! প্রচন্ড গরম!

আজওয়াদ গেইটের কাছেই আজওয়াদ রাস্তা ছিল। সেই রাস্তা ধরে একটু এগুলোই হাতের ডান দিকে ছিল আমাদের হোটেল। ভিড় না থাকলে হাঁটতে দশ/পনের মিনিট লাগত, কিন্তু হজের আগে দিয়ে সেটা আধা ঘন্টায় গিয়ে পৌঁছাতো!

Thursday, April 28, 2011

“বৃহত্তর স্বার্থ”, নরকের কীট, আমাদের অহংবোধ ও পাপবোধ

সেদিন ঘরে ফিরতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। সবার খাওয়া দাওয়া শেষ, অগত্যা টিভির সামনে একা বসে খেতে খেতে চ্যানেল ঘুরানো এবং এসবিএসের বিদেশী মুভ্যিতে আটকে যাওয়া। তুর্কি মুভ্যিটার নাম "তাকভা" (তাকওয়া), একজন খোদাভীরু সাধারণ মানুষ মুহররেম, নিজের মত করে আল্লাহকে যতটুকু বুঝে, মানার চেষ্টা করে। মুহররেমের সততা দেখে তাকে যখন বড় হুজুর নিজে ডেকে দরগার একাউন্টেন্ট হিসেবে বেছে নেন, তখন থেকেই মুহররেমের সাজানো গোছানো বিশ্বাসী মনটা উল্টে পাল্টে যাওয়া শুরু করে। খুব সুন্দর করে বলতে পারা আল্লাহ-অলা মানুষগুলোকে যখন কাছ থেকে দেখা শুরু করে, তখন অনেক কিছু মানতে কষ্ট হয় ওর। দরগা এবং দরগার সাথের মাদ্রাসার খরচ উঠে আসে কিছু বাড়ি ভাড়া থেকে। যখন একমাত্র জীবিকা অর্জনকারী স্বামী অসুস্থ বলে একটা পরিবার ভাড়া দিতে পারে না, তখন তাকে উঠে যাওয়ার নির্দেশ দেয় দরগা কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে মেদো মাতাল ভাড়াটিয়ে নিয়মিত ভাড়া দিয়ে যায় বলে তার হারাম টাকা নিতে দরগা-কর্তৃপক্ষের কোন দ্বিধা নেই। মুহররেম মানতে পারে না, 'আমরা আল্লাহর কথা বলছি, আমরা কি মেদো মাতালটাকে অন্য বাড়ি দেখতে বলতে পারি না? অসহায় পরিবারটাকে থাকতে দিতে পারি না?' বড় হুজুর খুব কোমল স্বরে বলেন, 'অবশ্যই পারি মুহররেম, তোমার চিন্তাটা খুব সুন্দর। কিন্তু এই দুটো ভাড়াটিয়ের ভাড়া না পাওয়ার কারণে যেই দুটো ছাত্রের বৃত্তি দেয়া বন্ধ করে দিতে হবে আমাদের, সেই ছাত্রগুলোকে তুমি বেছে দিও মুহররেম।' মুহররেম ভুল বুঝে, মাফ চায়।

***

"আজ অবধি মনের ভেতর আমরা লালন করে চলছি মধ্যযুগীয় এক বিশ্বাস। নিজের খোদা ব্যতীত অন্য খোদার সমর্থকদের জন্য রয়েছে আমাদের অপরিসীম ঘৃণার ভাণ্ডার। হুরবিশিষ্ট বেহেশতের ফুলেল বাগানে নিজেদের রাখলেও, নিজের মতোই দুইটি চোখ, একটি নাক, একটি হৃৎপিণ্ড বিশিষ্ট ভাইকে মনে করি নরকের কীট। এই নরকের কীটদের জন্য আমাদের ভালোবাসার প্রয়োজন নেই। কারণ আমাদের খোদা তাদের ভালোবাসেন নি। তিনিই তাদের অপরিসীম ঘৃণা করেন, আমরা তো কোন ছাতার মাথা। হ্যাঁ! লোকচক্ষুর খাতিরে আমরা তাদের সাথে মিশি, তবে "তাদের থেকে আমি শ্রেষ্ঠ" এই কথা আমরা ভুলে যাই না। আমরা মডারেটরা এই দর্শনে বিশ্বাস করি, যদিও আমরা নিজেদের হাত রঞ্জিত করি না। আমাদের নীরব সমর্থনের উপর দাঁড়িয়ে নিজের ভাইয়ের রক্ত রঞ্জিত হওয়ার কাজ করে আমাদের দলের স্পেশাল ফোর্স। আমরা প্রতিবাদ করি না, করলে আমাদের বুকিং দেওয়া বেহেশতের প্লটটা যে বেদখল হয়ে যেতে পারে।" (সূত্র)

***


কালকে হাবিব ওমরের একটা লেকচারে গিয়েছিলাম। এসবিএস, এখানকার অন্যতম বড় চ্যানেলের বিশিষ্ট জার্নালিস্ট, মার্ক ডেভিস গিয়েছিলেন ইন্টারভিউ নিতে। মার্ক ডেভিস কিছু প্রশ্ন করেছেন, শ্রোতারাও কিছু প্রশ্ন করেছেন। মার্ক ডেভিস রাজনৈতিক প্রশ্ন করেছেন মূলত, কিন্তু, হাবিব ওমর তাঁর সূফী দর্শনের জন্য বিখ্যাত। সুতরাং, হাবিব ওমর রাজনৈতিক প্রশ্নগুলোর উত্তর খুবই তাত্ত্বিক ভাবে দিলেন, যেটাকে হয়তো দালাই লামার অহিংস মতামতের মত টাঙিয়ে রাখা যাবে, কিন্তু প্র্যাক্টিকেলি, আম জনতার জন্য সলিড এবং ট্যানজিবল উত্তর না। যেমন যখন প্রশ্ন করা হয়েছে, অস্ট্রেলিয়ার মুসলিম আর অমুসলিমদের মধ্যে যে একটা দৃশ্যমান ভাগাভাগি আছে, এটার ব্যাপারে তাঁর কি মত এবং এটা দূর করতে হলে কি করতে হবে? তিনি উত্তর দিলেন, তিনি যতটুকু দেখেছেন এবং বুঝেছেন, এই ভাগাভাগিটা শুধু মুসলিম আর অমুসলিমের মধ্যে না, অনেকগুলো ভিন্নজাতি একসাথে থাকতে গেলে সব সময়ই এরকম হয়।

নারী দর্শকদের থেকে দুটো প্রশ্ন আসলো, একটা প্রশ্ন করেছে সিডনী গালর্স হাইস্কুলের একটা মেয়ে--মুহাম্মদ (সা) কিভাবে নয় বছরের আয়েশাকে বিয়ে করলেন আর আরেকটা প্রশ্ন ছিল একজন আইনজীবি নারীর কাছ থেকে—ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের প্লাটফর্মে স্ত্রী প্রহারের আয়াত দিয়ে ইসলামকে বিচার করা হয়, এ ব্যাপারে তাঁর কি মতামত?
***

আগে একসময় এগুলো নিয়ে খুব চোটপাট করতাম, বলতাম। এখন বলি না। আমাকে কেউ ব্যক্তিগত ভাবে এগুলো জিজ্ঞাসা করলে জবাব দেই। অন্যদেরকে কনফ্রন্ট করি না। কি বলে কনফ্রন্ট করব, ইসলামে এই আছে সেই আছে? থাকলেই কি? যতই ইসলামের পূর্ণ জাগরণ হোক, নতুন নতুন ইসলামিক টিভি চ্যানেল আসুক, চকচকে রঙিন বই বের হোক, প্রতিটা প্রশ্নের দাঁত ভাঙা জবাব জানা থাকুক, আসল ব্যাপারটা হচ্ছে, আমরা মুসলিমরা কুরআন আর ইসলামকে নিজেদের স্বার্থে “ব্যবহার” করা বন্ধ না করলে এগুলো আসতেই থাকবে।

ব্যবহারই করছি। হাদীসে আছে, "গুণাহ হচ্ছে যা নিয়ে ভিতরে অস্বস্তি হয়" (সহীস মুসলিম)

কিন্তু আমরা, মাহররেমের মত কত শুনেছি “বৃহত্তর” স্বার্থের কথা! দুইটা খারাপের মধ্যে কম খারাপটা বেছে নেয়ার কথা! ব্যাখ্যাগুলো টানতে টানতে এক সময় এমন লিপ সার্ভিস হয়ে যায়, যে নিজের ভিতরের আর্তচিৎকারগুলো তখন অনবরত দমিয়ে রাখতে রাখতে আল্লাহ প্রদত্ত মনের ভিতরের মনটা এক সময় অন্ধ, বধির আর বোবা হয়ে যায়।

যখন ইসলাম সম্পর্কে নতুন নতুন পড়তে শুরু করলাম, তখন দেখলাম চারিদিকে একটা ইস্যুতে দাওয়াহ ম্যাটেরিয়ালের অভাব নেই, তা হচ্ছে, অন্য ধর্ম কত পঁচা আর ইসলাম কিভাবে সেরা! যেন অন্য সব কিছুকে পঁচা প্রমানিত করে ইসলামকে উপরে উঠাতে হবে, ইসলামের এতই আকাল পড়েছে! রাজ্যের অবান্তর সব প্রশ্ন নিয়ে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর সেই একই প্যাঁচাল...ওরা গরু খায় না কেন, এতগুলা দেবতা কেন, খ্রীষ্টানরা কি আসলেই একত্ববাদে বিশ্বাসী...

আমি ছোটবেলা থেকে ইসলামকে এভাবে বুঝে এসেছি—মুসলিম নাম থাকলেই বেহেস্তের টিকেট কনফার্ম না আর অমুসলিম মাত্রই কাফির না। কাফির শব্দটার শাব্দিক অর্থ হচ্ছে যে সত্য জেনে তারপরে গোপন করে, জেনে বুঝে বিশ্বাসকে গ্রহন করতে রাজি হয় না, পার্থিব জীবনের মোহে... রাসুলের চাচা আবু তালিবও মৃত্যুর সময় সব জেনে বুঝে, কাছ থেকে রাসুলের জীবনে সত্যটাকে উপলব্ধি করে, কলেমা পড়তে গিয়েও পড়েন নি এই কারণেই: “আমি এখন কলেমা পড়ে মরে গেলে সবাই বলবে আবু তালিব তার বাপদাদার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, এটা আমি সহ্য করতে পারব না।“ কুরআন পড়লে সাধারণ অবিশ্বাসী আর কাফিরদের মধ্যে পার্থক্যটা খুব স্পষ্ট হয়ে যায়।

কাফিরদের চেয়েও নিচে অবস্থান মুনাফিকদের। সূরা বাকারার প্রথম বিশ আয়াতে বিশ্বাসীদের ব্যাপারে বলা হয়েছে ৪ আয়াতে, কাফিরদের ২ আয়াতে আর মুনাফিকদের ১৩ আয়াতে!
নিচের আয়াতটা পড়ে সত্যি করে বলুন তো চমকে উঠেন নি, নিজের জীবনে আপনার এরকম মুহূর্ত আসে নি!

“যখন তারা (মুনাফিকরা) নামাজ পড়তে দাঁড়ায়, তখন খুব অনিচ্ছার সাথে দাঁড়ায়, আর শুধু মানুষ যেন তাদের দেখে সে জন্য দাঁড়ায়। তারা আল্লাহকে স্মরণ করে, কিন্তু খুব কম!” (নিসা: ১৪২)

এই আয়াতটা পড়ে খুব চমকে উঠেছিলাম, আজীবন শুনে এসেছি মুনাফিকরা আসলে বিশ্বাস করে না, শুধু “ভান ধরে”, কিন্তু এখানে আল্লাহ স্পষ্ট বলছেন, “তারা আল্লাহকে (বিশ্বাস করেই) স্মরণ করে, কিন্তু খুব কম”! তারা নামাজও পড়ে!

আমাদের মধ্যে কয়জন বুকে হাত দিয়ে বলতে পারব, “বুকের ভিতরের খুঁচখুঁচে অনুভূতিটাই পাপ” হাদীসটা মেনে চলতে পারি, কয়জন বলতে পারব, আমি আল্লাহকে স্মরণ করি, অনেক বেশি?
আমাদের কাফির হওয়ার রিস্ক নেই হয়তো, কিন্তু নিজের ভিতরে আর চারিদিকে তাকালে মুনাফিকের বৈশিষ্ট্যগুলো দেখতে পাই অনেক বেশি! তাই আমি নিজে অন্তত অন্য কাউকেই নরকবাসী বলে ভাবতে পারি না...

অথচ, অথচ, সমাজে এই “আমি মুসলিম তাই বেহেস্তের টিকেটওয়ালা” কিংবা, “আমি ভালো মুসলিম ও খারাপ মুসলিম” টাইপের বিশ্বাসগুলো কি রকম ক্ষতের মত দগদগে হয়ে আছে... মানুষ এই গেড়ে থাকা বিশ্বাস থেকে ঘৃনা করে চলছে, ডিস্ক্রিমিনেইট করে চলছে, বিবাদ করে চলছে। ব্যাখ্যাগুলো টানতে টানতে ইলাস্টিসিটি ছুটিয়ে ফেলছে।

ইসলাম আর নারী... কি ভীষণ সেনসিটিভ একটা টপিক... কিন্তু এই নিয়ে যত ক্যাচাল তার জন্য আমরা ছাড়া আর কে দায়ী? আমরা কুরআনকে ব্যবহার করছি, সে জন্যই তো! প্রতিটা মুসলিম পুরুষ জানে একাধিক বিয়ে করা এবং বউকে কিছু শাসন করা স্বামী হিসেবে তার অধিকার, কিন্তু কয়জন মুসলিম পুরুষ জানে রাসুল তাঁর সারা জীবনে কোন নারীর গায়ে হাত তুলেন নি? প্রতিটা মুসলিম এই মিথ্যা হাদীসটা জানে: "স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেস্ত", কিন্তু কয়জন এই সত্য হাদীসটা জানে: “তোমাদের মধ্যে সেই সবচেয়ে ভালো যে তার স্ত্রীদের কাছে ভালো” (সহীহ মুসলিম)?

আমরা ইসলামের ঠিক ততটুকু মনে রাখি, যতটুকু আমাদের কাজে লাগে!

আমরা লেকচারের পর লেকচার শুনে যেতে পারি, বিশাল তাত্ত্বিক জ্ঞানী হয়ে যেতে পারি, তর্কাতর্কিতে ভার্চুয়াল যুদ্ধ করে জিহাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে পারি, “ইসলাম বিদ্বেষীদের ষড়যন্ত্র” আখ্যা দিয়ে অনেক কিছুর প্রতি অন্ধ হয়ে থাকতে পারি। কিন্তু এতে কিছুই হবে না! আমাদের এখন শুধু দরকার নিজেদের সাথে “সৎ” হওয়া। যা করি না তা বলা থেকে দূরে থাকা (সূরা সফ: ২)।

যা জানি তা সাথে সাথেই মানা শুরু করা। ফাঁক ফোঁকড় না খুঁজে, ইসলামের ব্যাখ্যাকে টানতে টানতে নিজের প্রবৃত্তির দাসত্বের জন্য জাস্টিফিকেশন না খুঁজে শুধু মনে রাখা, “যা করতে মনে খচখচে লাগে, তাই পাপ”।

এই কাজটা আমাদের সমাজ করিয়ে দিবে না, কোন ইসলামী সংগঠন করিয়ে দিবে না। প্রতিটা মানুষ জেনে বুঝে কোন পাপ করছে কি না, সেটা আল্লাহ আলাদা আলাদা করে বিচার করবেন, সে জন্য নিজে পাপ বুঝেও মনকে প্রবোধ দিয়ে যখন কিছু করে যাই, তার দায় আল্লাহ 'অন্য' কাউকে দিবেন না। এই যুদ্ধটা প্রত্যেকটা মানুষের জন্য, আলাদা আলাদা ভাবে, একেবারে নিজের মত করে। যতদিন আমাদের বেশির ভাগ মানুষ এতটুকু করতে পারছি না, ততদিন যত থিওরীই কপচানো হোক, কিছুতেই কিছুই হবে না। কারণ, "যেই কথা হৃদয় থেকে আসে, তা হৃদয়কে স্পর্শ করে। আর যা জিহ্বা থেকে আসে, তা শুধু কান পর্যন্ত পৌঁছে।" [হাবিব ওমর]

Sunday, April 03, 2011

হৃদয়ের পথে ১০: প্রস্তুতি পর্ব তিন

হজের জন্য মক্কায় পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত আমার একেবারেই সময় ছিল না একটু অতিরিক্ত পড়াশোনা করে নেয়ার। সেমিনার আর কোর্সে গিয়েছি ঠিকই, কিন্তু নিজে বসে বসে যে পড়াশোনাগুলো ভিতরে ঢুকিয়ে নিব, সেটা করতে পারি নি। মক্কায় পৌঁছানোর পরে সময়টা পাব জেনেই আগে থেকেই হজ সম্পর্কিত বই নিয়েছিলাম আর একান্তই
নিজের জন্য কিছু অতিরিক্ত জিনিস নিয়েছিলাম।

সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল অবশ্যই ইংরেজি অনুবাদ সহ ছোট্ট কুরআন। আর একটা লিস্ট—কুরআন অবতীর্ন হওয়ার ধারা। কুরআন যেভাবে রাসুল (সা) এর কাছে এসেছিল, আমরা কুরআনকে সেভাবে পড়ি না, রাসুল (সা) পরে আল্লাহর নির্দেশে কুরআনকে অর্থবহ ধারা অনুযায়ী সাজিয়েছিলেন। কিন্তু কুরআন যেভাবে এসেছিল, সেই ধারাটা ঐতিহাসিক পটভূমি হিসেবে দারুণ।

আমি মক্কায় আসা সূরাগুলোর আর মদীনায় আসা সূরাগুলোর ক্রমধারা করা লিস্ট আলাদা করে নিয়েছিলাম। মক্কায় আসা সূরাগুলো মক্কায় পড়েছিলাম আর মদীনার সূরাগুলো মদীনায়! আরবি কুরআন তো পড়তেই হবে সওয়াবের জন্য, কিন্তু বুঝাটা তার চাইতেই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারনত মানুষ অনেকটুকু আরবি পড়ে তারপরে অর্থ পড়ে। কিন্তু আমি একটা একটা করে আয়াত প্রথমে ইংরেজি অনুবাদটা পড়ে তারপরে আরবিতে পড়তাম। তাতে আরবি অংশটুকু পড়তে আগ্রহ লাগত, অর্থ জানার কারণে দু্ই একটা শব্দও ধরে ফেলতে পারতাম।

মসজিদুল হারামে বসে মক্কায় আসা সূরাগুলো পড়া শুরু করলাম... সেই কাবা যার সামনে সিজদা দেয়া অবস্থায় রাসুল (সা) এর পিঠের উপর উটের নাড়িভুড়ি চাপিয়ে দেয়া হতো, যার আশে পাশে কুরাইশরা প্রস্তাব করতো রাসুলকে বিপুল ধন সম্পদের মালিক করে দিবে যদি তিনি শুধু রাজি হন যে এক বছর তিনি মুসলিম থাকবেন আর এক বছর কুরাইশদের ধর্ম পালন করবেন... সেই কাবা যার আশে পাশে মানুষ জানতে চাইতো আল্লাহর বংশধারা সম্পর্কে, অহংকারী আবু লাহাব আর উম্মে জামিল কথার বিষ ছড়াতো, সেই কাবা যেখানে আবাবিলরা এসেছিল, হাতির পাল এসে সিজদায় লুটিয়ে পড়েছিল। মক্কার পাহাড়গুলো দেখে ভাবতাম, কোন পাহাড়ে দাঁড়িয়ে আল্লাহর রাসুল কাফিরদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন ওপাশে শত্ররা দাঁড়িয়ে আছে বললে ওরা বিশ্বাস করবে কি না? একজনের সূত্রে জানতে পেরেছিলাম রাসুলের চাচাতো বোন উম্মে হানীর ঘরের অবস্থান, ওখানে থাকা অবস্থাতেই মিরাজে গিয়েছিলেন রাসুল (সা)! সেই মিরাজ, যেটার কথা জানার পরে, “অবাস্তব গল্পসল্প” যুক্তির ভিত্তিতে কত কে ইসলাম থেকে দূরে সরে গিয়েছিল, শুধু আবুবকর অটল ছিলেন। সেই মক্কা, যেখানে কুরআনের অদ্ভূত সুন্দর বাক্যগুলো শুনে রাসুলকে কবি বলা হতো, আইডিয়াগুলো কথা শুনে তাঁকে পাগল বলা হতো, আবার কথাগুলোর শক্তি দেখে তাঁকে জাদুকর বলা হতো। কাবা, যেখানে আল্লাহ অসংখ্য ছোট ছোট সুন্দর সুন্দর বাক্যে আখিরাত
কে জীবন্ত করে এনেছিলেন মানুষের সামনে।

যেখানে কুরআন এসেছিল সেখানে কুরআন পড়তাম আর সব চরিত্র আর ঘটনাগুলো প্রান পেয়ে ফিরে আসত আমার কাছে। এখনও কুরআনের একই সূরাগুলো পড়লে সেই সময়গুলোর কথা মনে পড়ে...

সাথে আরও নিয়েছিলাম আল্লাহর নিরানব্বইটা গুণগত নাম। আগে যখন দেখতাম বাসায় বাসায় নামগুলো বাঁধাই করে সাজানো, তখন ব্যাপারটা কেমন খেতু খেতু লাগতো। সেই অনুভূতি থেকেই হয়তো, আল্লাহর নামগুলোর প্রতি ভালোবাসা আমার স্বাভাবিক ভাবে আসে নি। পুরা দুই দিন ইয়াসীর ফাজাগার মুখোমুখো সেমিনারে যখন একে একে নামগুলোর পরিচয় পেলাম, তখন আস্তে আস্তে ভালোবাসা তৈরি হলো। ইয়াসীর ফাজাগা থিওলজী পড়েছেন। সে জন্যই তিনি ব্যাখ্যা করে বলতে পারলেন আল আফু আর আল গাফুর পার্থক্য। দুটোই বাংলায় ক্ষমাশীল। কিন্তু “আফু” শব্দটার আরবি শব্দমূল এভাবে ব্যবহৃত হয়—কোন সমুদ্র সৈকতে হেঁটে গেলে যখন পায়ের ছাপ তৈরি হয়, আর ঢেউ এসে সেই ছাপটাকে এমন ভাবে ধুঁয়ে মুছে নেয় যে সেখানে ছাপ ছিল তা বুঝাই যায়। আল আফু, আমাদের সব ভুলগুলো সেগুলোর ইম্প্যাক্ট সহ এমন ভাবে ধুঁয়ে মুছে নিতে পারেন, যে বুঝারই উপায় থাকে না।

আর গাফুর শব্দমূল ব্যবহৃত হয় এভাবে—কোন এক জায়গায় এত মানুষ হলো যে সমস্ত এলাকাটা মানুষে মানুষে ঢেকে গেল, শেষ মেষ মাঠটা বালুর না ঘাসের, তাই আর দেখার উপায় নেই। আল গাফুর আমাদের ভুলগুলো এমন ভাবে ঢেকে ফেলতে পারেন, যে নিজের কাছেও সেই ভুল সময়টা অনেক দূরের কিছু হয়ে যেতে পারে।

ক্ষমাশীল তো ক্ষমাশীলই, কিন্তু শুধু গভীর অর্থগুলো জানার কারণে নামদুটো ব্যবহার করার অর্থই বদলে গেল আমার কাছে। এভাবে প্রতিটা নামের শব্দমূল, কুরআনে কোথায় এসেছে, এগুলো বিশদ পড়ে বুঝলাম, রাসুলের যুগে আরবের মানুষগুলো হয় সব জেনেশুনে, আল্লাহর ভীষণ কম্প্রিহেনসিভ একটা চেহারা চিনে তারপরে ইসলামে এসেছিল না হয় সব বুঝে শুনে কম্প্রিহেনসিভ আল্লাহ আর তাঁর ইসলামকে ছুঁড়ে ফেলেছিল। আমাদের সময় এই কাজটা কয় জন করে আমি জানি না!
আল্লাহর নামগুলো আমার এখন খুব প্রিয়, নামগুলো জানার কারণে আল্লাহর পরিচয়টাই পুরা বদলে যায়, আল্লাহকে অনেক বাস্তব আর কাছের মনে হয়। দোআ করার সময় মাঝে মাঝে বিভিন্ন নামে আল্লাহকে ডাকি, সে জন্যই লিস্টটা সাথে নিয়েছিলাম।

আর নিয়েছিলাম “বুলুগ আল মারামের” হজ সম্পর্কিত সমস্ত হাদীসের ফটোকপি। বুলুগ আল মারামের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানে পক্ষে বিপক্ষে, বড় হাদীস, ছোট হাদীস, সবল হাদীস, দুর্বল হাদীস নানা রকমের হাদীস একসাথে করা, তাই বেশ সার্বজনীন একটা ধারণা পাওয়া যায়। হাদীসগুলো পড়ে রাসুল কিভাবে হজ করেছেন, তার পুরাপুরি ধারণা পেতে চাচ্ছিলাম। রাসুল একবারই হজ করেছেন, সুতরাং এই নিয়ে খুব বেশি ক্যাচালের সুযোগ নেই!

এবং অবশ্যই, ফোরট্রেস অফ দ্যা মুসলিমস (হিসনুল মুসলিম)। বইটায় রাসুল (সা) এর করা দোআগুলো এক সাথে করা। ছোট্ট এই বইটা আমার ভীষণ প্রিয় কারণ বইটা পড়লে বুঝা যায় রাসুল আর আল্লাহর সম্পর্কটা কিরকম কাছাকাছি ছিল, গল্পের বইয়ের সংলাপের মত। এবং এমন না যে এগুলো এক পাক্ষিক সংলাপ, কারণ এর ফলগুলো আমরা রাসুলের জীবনে দেখেছিলাম! আল্লাহর সাথে আন্তরিক সংলাপে আমারও কখনও মনে হয় নি আমি একাই কথা বলছি!

মক্কায় এবং মদীনায়, দুটো হারামেই প্রতিটা, প্রতিটা নামাজের শেষে জানাজার নামাজ হতো। জানাজার নামাজের সওয়াবকে রাসুল (সা) দুই উহুদ পরিমান সওয়াব বলে ঘোষনা করেছিলেন। এত সওয়াব, তাও আবার হারামে, তবুও দেখলাম ওখানে অনেক মেয়েরাই জানাজার নামাজ পড়ে না। কি সহজেই সওয়াবটাকে চলে যেতে দেয়! আমার চেনা খুবই ধার্মিক একটা মেয়েকে জিজ্ঞাসা করেই বসলাম, পড়ে না কেন। ও বললো, ওর ভারতীয় মা খালারা কখনও জানাজার নামাজ পড়ে না, বরং জানাজার নামাজ পড়া মেয়েদের জন্য অন্যায় মনে করে! সিডনীতে ফিরে রিসার্চ করে দেখলাম, কট্টর হানাফী, কট্টর সালাফী এবং উদারপন্থী স্কলাররা সবাই বলছেন, জানাজার নামাজ মেয়েদের জন্যও। তাহলে এই ধারণা কোথা থেকে শুরু হলো কে জানে! সমাজ নাকি ধর্মের কথা বলে মেয়েদের পার্থিব দিক দিয়ে দাবিয়ে রাখতে চায়, শুধু কি তাই! সুযোগ পেলে ধর্মীয় দিক দিয়েও যে বঞ্চিত করা শুরু করে!

মৃতদের কেউ কেউ থাকতো হাজী, কেউ স্থানীয়। এক সাথে দশ বারো জনেরও জানাজা হতো (মসজিদুল হারামে সাতটা মৃতদেহ বয়ে নেয়ার ছোট্ট একটা ভিডিও)। মৃতদেহগুলোকে ফরজ নামাজ শেষ হলে সাথে সাথে মসজিদে ঢুকানো হতো। আবার জানাজার সাথে সাথে বের করে আনা হতো। আমি একবারই দেখেছিলাম মুতদেহগুলোকে মসজিদ থেকে বের করার দৃশ্য... মেয়েদের মুখ ঢাকা থাকতো আর ছেলেদের মুখ খোলা। কোন দেহ একেবারেই পাতলা, খাটিয়ার উপরে যে কিছু আছে, হঠাৎ দেখে বুঝার উপায় নেই। কোনটা আবার বিশাল, ঢাকা মুখ আর উঁচু পেট দেখে হঠাৎ চমকে যেতে হয়, আর কোন প্রান ছিল না তো ওখানে! আর একেবারে বাচ্চাদের ছোট্ট প্রানহীন দেহ... ওরা কবরে ভয় পাবে না তো! জানাজার নামাজের দোআ তখনই প্রথম শিখেছিলাম... মনে আছে, খুব আন্তরিকভাবে দোআ করতাম তখন, ক্ষীন আশায়, আমার মৃত্যুর পরেও কোন এক ভিনদেশী অচেনা মানুষ আমার জন্য হয়তো এভাবেই মন প্রান দিয়ে চাইবে আল্লাহর কাছে!

-----------

Sunday, March 20, 2011

হৃদয়ের পথে ৯: ইন্সপায়রেশনাল এবং রোমান্টিক


কাবা পৃথিবীর একমাত্র ঘর যা তাওয়াফ করা কখনও বন্ধ হয় না। আমরা নামাজে দাঁড়ালেও ফেরেশতাদের তাওয়াফ চলতে থাকে। এই ব্যাপারটা আমার আগে কখনও সেরকম সিগনিফিক্যান্ট মনে হয় নি, প্রথম যেদিন ফজরের নামাজের পরে সূর্যোদয়ের সময়ে তাওয়াফ করলাম, সেদিনের আগে। সেদিন ছাদে ফজরের নামাজ পড়েছিলাম। ছাদ থেকে নেমে এসে পাঁচ নম্বর গেইটের বরাবর, ঠিক রুকন ইয়ামীনের কাছে সিঁড়ি দিয়ে নামছিলাম। কাবার কালো চাদরের একটুখানি আর মসজিদুল হারামের ধূসর দেয়ালের এখানে সেখানে তখন সকালের সোনালী আলোয় ভরপুর। মেঘহীন আকাশটা স্নিগ্ধ নীল রং। একটু একটু ঠান্ডা বাতাস বইছে, সাদা পাথরের টাইলসগুলো তখনও একদম ঠান্ডা। চারিদিকে স্নিগ্ধতার ছড়াছড়ি। সকালের সতেজ মন নিয়ে আল্লাহকে পাওয়ার আশায় চুপচাপ তাওয়াফ করে যাচ্ছে এক দল মানুষ।
এই দৃশ্যের সৌন্দর্যটুকু পুরাপুরি উপলব্ধি করার আগেই দেখলাম ব্যাপারটা। এক ঝাঁক কালো ছোট ছোট পাখি কোথা থেকে উড়ে এসে হঠাৎ ঠিক অ্যান্টি ক্লক ওয়াইজ ডিরেকশনে কয়েকবার উড়ে গেল কাবার উপর দিয়ে! একটা দুইটা পাখি কোন নির্দিষ্ট দিকে ঘুরলে চোখে পড়ে না, কিন্তু এক ঝাঁক পাখির গতিবেগ খুব স্পষ্ট থাকে! ওরা চলে যেতেই দেখলাম আরেক দল পাখি আসল! চিক চিক শব্দে কি যেন বলতে বলতে কয়েকবার ঘুরে গেল কাবার উপর দিয়ে, অ্যান্টি ক্লক ওয়াইজ, ঠিক যেভাবে তাওয়াফ করতে হয় সেভাবে! দৃশ্যটা এত সুন্দর, এতই সুন্দর ছিল, সকালের সোনালী রোদ, অ্যান্টি ক্লক ওয়াইজে ঘুরতে থাকা লাখ মানুষ, অ্যান্টি ক্লক ওয়াইজে ঘুরতে থাকা অনেকগুলো কালো পাখি, আর মাঝখানে পৃথিবীর প্রাচীনতম উপাসনালয়... আমার মনে হচ্ছিল পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ন্যাচারাল ইভেন্ট ক্যামেরায় ধরে রাখতে তখন আমার শুধু একটা ক্যামেরা লাগত, সাবজেক্ট, লাইটিং, সবই পারফেক্ট ছিল!

আমার সাইন্টিফিক মনটা সেদিন আপ্লুত হলেও বুঝেছিল, বিশ্বাসীদের মন এরকমই। হঠাৎ ঘটে যাওয়া ব্যাপারকেও আলৌকিক ভেবে নেয়, তাই পাখিদের সাধারণ উড়ে যাওয়াটাকেও তাওয়াফ মনে হয়। কিন্তু জানেন কি, আমরা প্রতিদিন সূর্যোদয়ের পর পর তাওয়াফ করতাম, আর প্রতিদিন এই ব্যাপারটা দেখতাম! আর প্রতিটা দিন আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম সিঁড়ির উপর থেকে। নও অনেক পাখি চিনে, কিন্তু বলতে পারল না এটা কি পাখি। আমাদের দু,জনকেই পাখিগুলো দেড় হাজার বছর পিছনে নিয়ে যেত... পাখিগুলোকে দেখলেই খুব আবাবিল আবাবিল মনে হতো!

হজ নিয়ে যখন পরে হাজীদের সাথে কথা হচ্ছিল, তখন দেখলাম অনেকেই ব্যাপারটা খেয়াল করেছে! মজার ব্যাপার হচ্ছে, হজ নিয়ে অনেক পড়েছি, কিন্তু কোথাও পাই নি এটা!

সেই মুহূর্তটার কোন ছবি তুলি নি। একদিন সূর্যোদয়ের সময় ছাদ থেকে তোলা নিচের ছবিগুলো... খুব খেয়াল করলে দেখা যাবে আমাদের আবাবিলগুলোকে!



প্রথম দিকে বলেছিলাম, ইসমাইল ডেভিডস পই পই করে বলে দিয়েছিলেন সূরা হজ পড়তে। কিন্তু সূরা হজের বেশির ভাগ জুড়েই আখিরাতের কথা, আর কেয়ামতের কথা। কেন? ইসমাইল ডেভিডস ব্যাখ্যা করেন নি, বলেছিলেন, ভাবতে থাকো, তুমি নিজেই বুঝতে পারবে।

বুঝেছিলাম প্রথম যেদিন দুপুরবেলা তাওয়াফ করলাম। তখন মাথার উপরে সূর্য্য। আকাশে বিন্দুমাত্র মেঘ নেই। কাবার চত্ত্বরে মানুষ আছে অনেক, কিন্তু ভিড়টা খুব সহজেই চলে যাচ্ছে, এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকছে না। পায়ের নিচে তেতে থাকা সাদা টাইলসের উপর পা বাড়িয়ে সাহস করে তাওয়াফ শুরু করেই দিলাম। সে কি গরম.. চারিদিকে সবাই দরদরিয়ে ঘামছে, তীব্র রোদে পুড়ছে, কিন্তু কোন উচ্চবাচ্য নেই, মুখে বিরক্তি নেই... সবাই মাথা নিচু করে নিজের মত করে ঘুরে যাচ্ছে, আল্লাহকে ডাকছে, নিরব কান্নায় বুক ভাসিয়ে দিচ্ছে... নাকের পানি চোখের পানি মিলে একাকার, বুড়া লোকটার দাঁড়ি ভিজে যাচ্ছে, সবল আফ্রিকান জোয়ান ছেলেটা হাউ মাউ করে কাঁদছে... সেদিন আমি আল্লাহর সামনে বিনয় দেখেছিলাম, আত্মসমর্পন দেখেছিলাম। সেদিন আমি ইসমাইল ডেভিডসের বলা ওই কথাটার অর্থ খুঁজে পেয়েছিলাম, “হজ ইজ দ্যা মোস্ট ইনডিভিজুয়াল জার্নি এভার”... হাজার মানুষের ভিড়ে আল্লাহর সামনে আমি সত্যিই একা দাঁড়িয়েছিলাম সেদিন।

আখিরাতে যে দুজন মানুষের পারষ্পরিক বিচার সবচেয়ে আগে হবে, তারা হচ্ছে স্বামী এবং স্ত্রী। সেদিন, যখন কিয়ামতের উপলব্ধি হচ্ছিল, তখন আমার হাত ধরে ছিল নও। যেই মানুষটাকে পাশে নিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে একদিন। যেই মানুষটার সাথে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে আমি ঝগড়া করতে চাই না, বরং তীব্র কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই। সেদিন, যেদিন সব সত্য বের হয়ে আসবে, নিজের ভিতরে লুকানো গোপনতম অনুভূতিগুলোও...

কাবার চত্ত্বরে তাওয়াফ করতে হলে প্রচন্ড ভিড়ে তাওয়াফ করা খুব কষ্ট হয়ে যেত বলে নও সব সময় আমাকে পিছন থেকে দুই বাহু দিয়ে আগলে ধরে রাখত। ও হাতগুলো আমার সামনে এনে এমন ভাবে রাখত যেন আমার সামনে কোন পুরুষ থাকলে খুব ভিড়ে তাদের গায়ে আমাকে গিয়ে পড়তে না হয়, বাম্পারের মত প্রটেক্ট করতো আমাকে! কখনও কখনও আবার হঠাৎ ভিড় বেড়ে গেলে রীতিমত 'পিষ্ট' হতে হতো মানুষের চাপে। সেই সময়টায় নও আমার চারপাশে একটা 'বলয়' তৈরি করে রাখত, যেন বিন্দুমাত্র কষ্ট না হয় আমার। ও আমার চেয়ে ভালোই লম্বা বলে ওকে দেখে মনে হতো না যে ওর কষ্ট হচ্ছে খুব, কিন্তু খুব ভিড়ের মধ্যে ব্যাপারটা খুব সহজও হওয়ার কথা না! অনেক ভিড়ে তাওয়াফ করেও আমি সব স্পর্শ বাঁচিয়ে তাওয়াফ করে এসেছি! অবশ্য আমি আর নও একা ছিলাম না এদিকে, প্রচুর দম্পত্তিকে দেখেছি এভাবে তাওয়াফ করতে। আবার কত দেখেছি স্বামীরা আগে আগে দৌঁড়াচ্ছে, পাঞ্জাবীর কোণা ধরে কোন রকমে পিছু পিছু দৌঁড়াচ্ছে স্ত্রী (বিশেষত ভারতীয় উপমহাদেশীয় স্ত্রীরা), স্ত্রী আস্তে হাঁটবে বলে স্ত্রীকে নিজের মত করে তাওয়াফ করতে বলে দিয়েছে, অথচ, স্ত্রীকে একটু সাহায্য করলে সওয়াব নিশ্চয়ই কমতো না!

তাছাড়া, এতটা কাছাকাছি তাওয়াফ করায় আল্লাহর সামনে নিজেদের যতটা ভালনারেবল অবস্থায় পেয়েছি, সেভাবে আগে কখনও পাই নি। পুরা দুই বছরে এক সাথে থেকেও আমি নওয়ের চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়তে দেখি নি, ওর খুব দুর্বল মুহূর্তে, যখন ওর সবচেয়ে প্রিয় মানুষ, ওর মাকে ছেড়ে আসছে, তখনও না। ওকেই যখন দেখলাম তাওয়াফ করতে করতে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পন নিয়ে অনর্গল কাঁদতে, তখন আমি আমার সব দোআ ভুলে গিয়ে দোআ করছিলাম আল্লাহ যেন নওয়ের সব দোআ কবুল করে নেয়... এরকম একটা মুহূর্তে কত কিছু যে নতুন করে তৈরি হয়!

তাওয়াফ ব্যাপারটা তাই আসলে বেশ রোমান্টিক। কেউ যেহেতু কারও দিকে তাকায় না, কাবা এলাকা তাই আশ্চর্য রকমের আধুনিক এবং মুক্ত! কাবার ছাদে তুলেছিলাম নিচের ছবিটা, স্বামীর মাথা কোলে নিয়ে কোরআন তেলওয়াত করছেন স্ত্রী।

পৃথিবীর সবচেয়ে কনজারভেটিভ মুসলিম দেশে এবং পৃথিবীর প্রাচীনতম মসজিদে যা সম্ভব, পৃথিবীর সবচেয়ে লিবারেল দেশের সবচেয়ে মডার্ন মসজিদেও কি তা ভাবা যায়!

সোবহানাল্লাহ, মসজিদুল হারামে প্রতিদিন এরকম কত কি যে দেখে আপ্লুত হতাম, ইন্সপায়ারড হতাম! একদিন খুব ক্লান্ত হয়ে তাওয়াফ করার সময় দেখলাম আমাদের বয়সেরই একটা আফ্রিকান ছেলেকে, ওর বাঁ পা-টা ডান পায়ের চেয়ে অন্তত এক বিঘত ছোট এবং একদিকে বাঁকানো। ও এভাবেই এক পা টেনে টেনে, সামনে পিছনে দুলে দুলে তাওয়াফ করে যাচ্ছে প্রচন্ড ভিড়ের মধ্যে... ছেলেটের গায়ে ইহরাম ছিল না, তার মানে বাধ্যতামূলক তাওয়াফ ছিল না ওটা...

আরেকদিন ছাদে তাওয়াফ করছিলাম, তেমন ভিড় ছিল না। পিছনে লাঠির শব্দ শুনে সরে দাঁড়িয়েছিলাম। দেখি লাঠি হাতের মহিলাটার আপাদমস্তক কালো বোরখা পরা, চোখগুলোর উপরেও কালো কাপড়, এক হাত দিয়ে আগলে ধরে আছে পাশের পুরুষের বাহু। ওর লাঠির দিকে চোখ যেতেই ধাক্কা খেলাম... অন্ধদের সাদা লাঠি। বের হওয়ার সময় আবারও দেখেছিলাম ওঁকে, পায়ে জুতা পরিয়ে দিচ্ছিলেন সাথের পুরুষ সাথী।

দু ধরণের মানুষ দেখলে আমি অনেক্ষন তাকিয়ে থাকতাম। শিশুরা--অনেক শিশুদের দেখেছি বাবার কাঁধে চড়ে, মায়ের পিঠে কাপড়ের পোটলায় ঝুলে ঝুলে তাওয়াফ করছে, কিন্তু কোন বাচ্চাকেই কাঁদতে দেখলাম না, আর একেবারে বুড়া বুড়া মানুষগুলো যখন তাওয়াফ করতে গিয়ে হু হু করে কাঁদতে থাকত। ওদেরকে দেখে বুঝতাম, ওরা যেভাবে গত জীবনের অর্থ বুঝতে পারছেন, যেভাবে আল্লাহর কাছে সত্যিকারভাবে আত্মসমর্পন করছেন, যেভাবে সামনে আসতে থাকা বাস্তবতা মৃত্যুকে দেখছেন, যেভাবে ডেসপারেইটলি চাইতে পারছেন, আমি পারতাম না তার কিছুই...

হৃদয়ের পথে ৮: "ভালো সময়"

যেহেতু মসজিদুল হারামে তাওয়াফের সওয়াব নফল নামাজের চেয়ে দেড় গুণ বেশি, সে জন্য শুধু ফরজ নামাজের সময় স-অ-ব কিছু স্থির থাকে... ফরজ নামাজের ইকামত দাঁড়ানোর ঠিক আগ পর্যন্ত চলতে থাকে তাওয়াফ, তারপরে সালাম ফেরানোর সাথে সাথে শুরু হয় সেই অ্যান্টি ক্লক ওয়াইজ, ক্লান্তিহীন, বিরতিহীন ইবাদত। আমাদের একটা তাওয়াফ করতে গড়ে এক ঘন্টার কিছু বেশি লাগত। কাবার যত কাছাকাছি তাওয়াফ করা যায়, কম দুরত্বের জন্য সময় কম লাগার কথা। কিন্তু হজের সময়ে কাবার চত্ত্বরে (মাতাফ, সাদা জায়গাটায়) প্রচন্ড ভিড় থাকে, বিশেষত যে সময়টাতে মানুষের তাওয়াফ করা সুবিধা, সে সময়টায় খুব ভিড় থাকতো।

আমি খুব ভিজুয়াল লার্নার, কেউ মুখে মুখে ডিরেকশন দিলে কিচ্ছু বুঝতে পারি না, ম্যাপ দেখে সেটা এক মিনিটে বুঝে ফেলি! বরাবর পড়া মুখস্ত করতাম এঁকে এঁকে। সে জন্য তাওয়াফে কখন ভিড় থাকে সেটা বুঝাতে একটা চার্ট এঁকে ফেললাম! নিচে ছবিতে দেখুন “মিডনাইট”, অর্থ্যাৎ মধ্য রাত থেকে শুরু করে পুরা এক দিনের সময় দিয়েছি নিচে, আর উপরে আঁকা নীল দাগটা যত উপরে থাকবে, ভিড় তত বেশি থাকে! লাল হার্টটার অর্থ হচ্ছে, সেই সময়ে তাওয়াফ করা আমি পছন্দ করতাম! আর হলুদ মন খারাপ করা মুখটার অর্থ হচ্ছে, সেই সময়ে তাওয়াফ করা রীতিমত ভয় পেতাম!

বিস্তারিত বলছি... তাহাজ্জুদের আজান হওয়ার সাথে সাথে (আমাদের সময়ে চারটার দিকে) খুব ভিড় শুরু হয়ে যেত। তাই ঠিক আজানের মোটামোটি এক ঘন্টা আগে যাওয়া গেলে খুব শান্তিতে তাওয়াফ করা যেত কাবার চত্ত্বরে। আবার ফজরের নামাজের পরেও খুব ভিড় থাকত। সেই ভিড়টা ঘন্টা খানেক পর্যন্ত থাকত। তার মানে কিছু মানুষ ফজরের নামাজের জন্য একটু আগে এসে তাওয়াফ সারতো আর কিছু মানুষ নামাজের পরে তাওয়াফ করতো। তারপরে আবার মোটামোটি সূর্যোদয়ের সময় থেকেই সকাল আটটা পর্যন্ত বেশ ফাঁকা একটা সময় যেত। বুঝলাম তখন হয়তো রাত জেগে ইবাদতকারী মানুষগুলো ঘরে ফিরে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন! তাই সেই সময়টায় আমরা চামে চামে তাওয়াফ সেরে নিতাম (প্রথম লাল হার্ট!)! আটটার সময়ই আবার ভিড় শুরু! তার মানে অনেকে ফজরের নামাজ শেষে ঘরে ফিরে যেত, তারা হয়তো নাস্তা টাস্তা করে ফিরে আসতো তাওয়াফ করতে! একটু পরে ভিড় একটু কমলেও মোটামোটি আটটা থেকেই রোদ শুরু হয়ে যেত। আমি যেহেতু গরম একটু কম সহ্য করতে পারি... সে জন্য আমরা কখনও তখন তাওয়াফ করতাম না।

মধ্যদুপুরে, মোটামোটি সাড়ে এগারোটা থেকে আবার ভিড় কমে যেত। তখন প্রচন্ড রোদ থাকতো, মক্কার রোদ, মেঘহীন আকাশ, পুরাপুরি শুষ্ক, মরুভূমির রোদ... সাদা পাথরের টাইলসগুলো তখন তেঁতে থাকত। সেই সময়টায় বড় বড় গ্রুপগুলো তাওয়াফ করতো না, কারণ একটা গ্রুপে অনেক বয়সের আর ক্ষমতার মানুষ থাকে। তখন তাই গরমটা উপেক্ষা করা গেলে বেশ শান্তিতে তাওয়াফ করা যেত! রোদটা একটু পড়ে আসলেই আবার চত্তরে প্রচন্ড ভিড় শুরু হয়ে যেত... তখন আমি আর তাওয়াফ করতে পারতাম না ওখানে। একেবারে ছাদে চলে যেতাম। ছাদে খুব জোরে তাওয়াফ করতেও আমার লাগতো দেড় ঘন্টা! তার মানে এক কিমি হাঁটতে যদি পনের মিনিট লাগে, তাহলে দেড় ঘন্টায় তিন কিমি হাঁটা!!! কিন্তু সত্যি বলতে কি, ভিড়ে এদিক সেদিক থেকে গুঁতা খাওয়ার চেয়ে ছাদে তিন কিমি হেঁটে তাওয়াফ করতেই আমার অনেক বেশি শান্তি লাগত!

রাত দশটা থেকে মোটামোটি আবার ফাঁকা হয়ে যেত, কারণ তখন কোন গ্রুপ তাওয়াফ করতো না, আর যারা দূরের হোটেলে থাকেন, তারা চলে যেতেন। কিন্তু আমরা চেষ্টা করতাম রাত দশটা থেকে ঘুমানোর, সে জন্য ওই কম ভিড়ের সময়টা আমরা সব সময় মিস করতাম! আমাদের পরিচিত একটা সাউথ আফ্রিকান দম্পত্তি সারা দিন নামাজের ফাঁকে ফাঁকে ঘুমিয়ে নিত, তারপর রাতে এসে একবারে দৌঁড়ে দৌঁড়ে আধা ঘন্টায় এক একটা তাওয়াফ করে অনেকগুলো তাওয়াফ এক সাথে সেরে নিত!

ওই যে বললাম, ছাদে দুরত্ব বেশি বলে একটা তাওয়াফ করা মানে তিন কিমি হাঁটা! আর কাবার কাছ দিয়ে, চত্ত্বরে তাওয়াফ করা মানে ভিড়ের মধ্যে অন্তত এক ঘন্টা হাঁটা! কাবার কাছে গেলে দিনে একটা বা দুইটা তাওয়াফে ঠিক তৃপ্তি আসে না, আরও করতে ইচ্ছা করে। ধরুন, কাবার চত্ত্বরে হাঁটতে এক কিমি হাঁটা লাগল, তারপরেও এক দিনে তিনটা তাওয়াফ করতে হাঁটা লাগবে—
ছাদে একটা তাওয়াফ = ৩ কিমি
চত্ত্বরে দুইটা তাওয়াফ = ২ কিমি
হারাম থেকে তিন বার হোটেলে যাওয়া আসা (আমাদের জন্য ছিল) = ৩ কিমি

তারপর তো আছেই নামাজের আগে পরে বিশাল মসজিদুল হারামের এপাশ থেকে ওপাশে যাওয়া! ওই হাঁটাগুলো বাদ দিয়েই অনায়েসে ৮ কিমি হাঁটা হয়ে যাচ্ছে!

সুতরাং রীতিমত দুধর্ষ রকমের শারিরীক পরিশ্রম যায়! তাছাড়া, কোন সময়ে ভিড় কম থাকে, কোন জায়গায় ভিড় কম থাকে, এগুলো কিন্তু হঠাৎই বুঝা যায় না, বেশ এক্সপেরিমেন্ট করে, বিভিন্ন সময়ে গিয়ে গিয়ে, বিভিন্ন জায়গায় তাওয়াফ করে আস্তে আস্তে বুঝতে হয়। শুধুমাত্র তাওয়াফের উদাহরণটুকু নিলেই বুঝা যায়, হজ কেন অল্প বয়সে করা উচিত, হাড্ডিতে জং ধরে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত না! কিন্তু তবু, তবুও লাখ লাখ মানুষের মধ্যে চল্লিশের নিচে খুব অল্প সংখ্যক মানুষকেই পেয়েছি, থুড়থুড়ে বুড়িদের দেখেছি, ছেলের পিঠে চড়ে হজ করছে, ভাড়া করা হুইল চেয়ারে হজ করছে, ভাড়া করা মানুষ নিয়ে ঠেলে বেড়াচ্ছে, মানুষ খুঁজছে যে টাকার বিনিময়ে হলেও পাথর ছুঁড়ে দিবে, আর তীব্র আফসোস করতে করতে বলতে শুনেছি, “ভেবেছিলাম সব গুছিয়ে হজ করব, কিন্তু এখন বুঝি, বুড়া মানুষের জন্য হজ না!”

আমরা প্রতিদিন ৮ কিমি (কখনও আরও বেশি) হেঁটে ঘরে ফিরতাম ক্লান্ত হয়ে, তারপরে একটা গোসল করে মাত্র চার ঘন্টার ঘুম দিয়েই সকাল বেলা উঠে দেখতাম শরীর পুরা ঝরঝরে! বাঙালী মেয়ে তো, কখনও স্পোর্স্ট করি নি, কিন্তু সত্যি বলছি, হজের এক মাস যতটা ঝরঝরে লেগেছে, যতটা সুস্থ ছিলাম, আমার জীবনে খুব অল্প সময়ই সেরকম সুস্থ ছিলাম! অ্যাড্রানালিন রাশ কাকে বলে, কেন মানুষ জিমে ঘন্টার পর ঘন্টা এক্সারসাইজ করে, সেটা সেই এক মাসে বুঝেছিলাম! তাওয়াফগুলো আমার কাছে কষ্টের মনে হয় নি সত্যিই! স্পিরিচুয়াল প্রশান্তি তো সবচেয়ে বড় পাওনা হিসেবে ছিলই!

তাই বলি, সুযোগ থাকলে দেরি করবেন না প্লীজ!

হৃদয়ের পথে ৭: নামাজ

আমার যে দিকগুলো খারাপ লেগেছিল, সেগুলো আগে ভাগে বলে নিলাম। খারাপ লাগাগুলো প্রথম দিকেই ছিল। আস্তে আস্তে মসজিদুল হারামের গভীর প্রেমে পড়ে গেলাম! তখন যেগুলো প্রথম দিকে খারাপ লাগত--মানুষের ধাক্কাধাক্কি, শুধু নিজেকে নিয়ে চিন্তা করা, সেগুলোকেও খারাপ লাগত না। যারা এমন করত, তাদের জন্য এক্সকিউজ দাঁড় করাতে শিখে গেলাম, জানে না, ভিন্ন সমাজে বড় হওয়া, ইত্যাদি।

মসজিদুল হারামের সম্মানে, পুরা মক্কার যে কোন জায়গায় নামাজ পড়লে সাধারন সওয়াবের এক লাখ গুণ বেশি সওয়াব হয়! তার উপর তো জামাতে নামাজের সওয়াব আছেই, বাসায় পড়া নামাজের চেয়ে সত্তর গুণ বেশি! সিডনীতে আমার যে কোন নামাজের যে লাখ লাখ গুণ বেশি মূল্যবান নামাজ জেনেই পড়তে যেতাম প্রতিটা নামাজ।

সিডনীতে আজান শোনার তো প্রশ্নই উঠে না, আমি বড় হয়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। যারা ঢাবি এলাকায় থেকেছেন, তারা জানেন, ঢাকা মসজিদের শহর হলেও, ঢাবিতে আজান শোনার উপায় নেই। ফলে আমার জীবনে আসলে দিনে পাঁচ বার আজান শোনার অভিজ্ঞতা খুব অল্প। সেই আমি সুযোগ পেয়ে গেলাম পুরা এক মাসের জন্য দিনে পাঁচবার আজান শোনার! তাও মসজিদুল হারামের আজান শোনার সৌভাগ্য, যেখানে প্রথম সিজদায় মাথা ঠেকিয়েছেন আদম (আ)। এই এক মাসেই আজানের দোআগুলো মুখস্ত হলো আমার, আগে কখনও প্রয়োজন পড়ে নি বলে মুখস্ত করা হয়ে উঠে নি!

মসজিদুল হারামের সাউন্ড সিস্টেম অসাধারন। মসজিদের যে জায়গাতেই থাকেন না কেন আপনি, মনে হবে একেবারে কাছ থেকে আজান হচ্ছে! ঢাকায় যেমন পাঁচ মসজিদের আজান এক সাথে হয়ে কোনটাই আর বুঝা যায় না, এক এক সময় আসলে 'সাউন্ড পলিউশন-ই' মনে হয়, এখানে সেরকম না। কোন রকম ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ নেই, শুধু আজান, নামাজের দিকে মানুষের আহবান। সেই ভিতরটা ছোঁয়া, উল্টে পাল্টে দেয়া আজান, কেউ যদি নিজে থেকে অনুভব করে না শুনে থাকেন, তাহলে সত্যিই বুঝতে পারবেন না... শুনতাম আর ভীষণ কৃতজ্ঞ বোধ করতাম আল্লাহর প্রতি... আর আজানের প্রতিটা শব্দ কি ভীষণ অর্থবহ হয়ে যেত...

মনে আছে, একদিন খুব টায়ার্ড ছিলাম, জোহরের পরে রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছি। আসরের নামাজ মসজিদে পড়তে পারি নি। যতদিন মক্কায় থেকেছি, খুব অল্প নামাজই মসজিদে পড়ি নি। কি যে আফসোস হচ্ছিল! তারপর যখন মাগরিবের জন্য মসজিদে আসলাম, তখন আজানের 'হাইয়া আলাস সালাহ' (এসো নামাজের দিকে) শুনতে শুনতে যখন 'লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ' (আল্লাহ ছাড়া অন্য সবাই ক্ষমতাহীন) বলছিলাম, তখন খুব ইমোশনাল হয়ে গিয়েছিলাম। আসলেই আল্লাহ করার তওফিক না দিলে কিচ্ছু করার উপায় নেই... কিচ্ছু না... কত কিছু মনে পড়ে গেল, কত প্ল্যান, সব কিভাবে ভেস্তে যায়, আর আল্লাহর ইচ্ছার কথা মনে করতে হয়। আবার কত কিছু অভাবনীয় ভাবে পেয়ে যাওয়া, তখনও আল্লাহকে মনে হয় খুব বেশি করে! আগে আমার আজান ক্লক ব্যাপারটা কেমন যেন মেকি মেকি লাগত, ভাল্লাগতো না। কিন্তু সিডনীতে ফিরে আসার পরে যখন একটা আজান ক্লক গিফট পেলাম, সেটা ঠিক যত্ন করে ঘরে রেখে দিলাম। মনযোগ দিয়ে আজান শুনি, আর এখনও খুব উল্টা পাল্টা দিন কাটলে 'হাইয়া আলাস সালাহ' অংশটা আসলে খুব ইমোশনাল হয়ে যাই।

আজান আর ইকামতের মাঝখানে সব দোআ কবুল হয় বলে তখন ভেজা মন নিয়ে কত কিছু চেয়ে নিতাম আল্লাহর কাছে...

মসজিদুল হারামে সকালে দুইটা আজান হয়, তাহাজ্জুদের আজান আর ফজরের আজান। প্রথম দিকে তাহাজ্জুদের জন্য মসজিদে থেকে একটু আত্মতৃপ্তি হচ্ছিল, হুহ, সারা জীবন কত কষ্ট করেও তো তাহাজ্জুদের জন্য উঠতে পারি না, এখন কি সহজেই মসজিদে চলে এসেছি, আত্মতৃপ্তি হবে না! অমা, কিছুক্ষণের মধ্যে দেখি মসজিদে তিল ধারণের আর জায়গা নেই! সত্তর, আশি, নব্বই বছরের থুড়থুড়ে বুড়া বুড়িরা, এমনকি তিন বছরের বাচ্চা কাচ্চা সহ মাবাবারাও চলে এসেছে মসজিদে! তখন প্রথম টের পেয়েছিলাম, আল্লাহকে খুশি করার জন্য যে প্রতিযোগিতা, এই প্রতিযোগিতাটা আসলে বেশ ভালোই প্রতিদ্বন্দিতাময়, এখানে আমার জেতার কোন চান্স নেই!

প্রিয় আজান মুহূর্ত:

১. ঠিক কাবার সামনে মেয়েদের জায়গায় নিজের অবস্থানটা অনেক যুদ্ধ করে টিকিয়ে রেখেছিলাম সেদিন! যখন ফজরের আজান শুরু হলো, অদ্ভূত সুন্দর কণ্ঠে, সুরে, কথায়... আমার ঠিক সামনে কাবা, পৃথিবীর প্রাচীনতম প্রার্থনাঘর... তখন নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবতী মানুষ মনে হচ্ছিল...

২. তখনও মসজিদুল হারামে তেমন ভিড় শুরু হয় নি। ছাদে উঠেছিলাম মাগরিবের নামাজ পড়তে। হঠাৎই পেয়ে গেলাম এক দঙ্গল মালয়শিয়ান বোন! সবাই এক সাথে, নামাজের সুশৃংখল লাইন করে বসে আছে। কিন্তু ছাদের রেলিঙের পরেই, সবচেয়ে সামনের লাইনে একজন লোক বসে আছে বলে তার পাশে বেশ বড় একটা ফাঁকা রেখে তারপরে বসেছে অন্য মেয়েরা। তাড়াতাড়ি আমি আর নও চলে গেলাম ওখানে। নও বসলো লোকটার পাশে, তার ডান পাশে আমি, আমার ডান পাশে মালয়শিয়ান একজন বোন। সেখানে বসে রেলিঙের ফাঁকা দিয়ে দেখতে থাকলাম পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যগুলোর একটা। কাবা, আর কাবাকে ঘিরে আল্লাহকে স্মরণ করতে থাকা হাজার হাজার মানুষ... সে কি নিরন্তন ভাবে ঘুরছে আর ঘুরছে, ক্ষমা আর সন্তুষ্টি পাওয়ার আশায়... ঠিক সেই মুহূর্তেই আজান হলো... চারিদিক ছাপিয়ে... আর মুহূর্তেই হাজার হাজার মানুষগুলো কিভাবে যেন সুশৃংখল লাইনে লাইনে দাঁড়িয়ে গেল!

এই ছবিটা কবে তুলেছি মনে নেই, কিন্তু মোটামোটি এই অবস্থান থেকে এরকম দৃশ্যই দেখছিলাম মনে আছে...



৩. হজের পরে একদিন তাহাজ্জুদের সময় মসজিদে যাচ্ছিলাম। ঠিক যখন ছাদের পথে উঠছি, তখনই আজান শুরু হলো। আর তখনই নও দেখালো বাঁ দিকের আকাশে এত্ত বড় চাঁদ! সেদিন আমি ছবি তুলি নি, নওয়ের মোবাইলে তোলা ছবিগুলো দিচ্ছি। ছবিগুলোর মান তেমন ভালো না হলেও আমার কাছে ছবিগুলো অসম্ভব রকমের স্মৃতি জাগানিয়া আর অসাধারন!




৪. ছাদে বসে বসে ফজরের আজান শুনছিলাম... উপরে তাকিয়ে দেখি আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ, হুড়মুড়িয়ে ভেসে যাচ্ছে পূর্নিমার চাঁদের উপর দিয়ে, আস্তে আস্তে চাঁদটাকে উম্মোচন করে... সেই মুহূর্তে ওই দৃশ্যটা দেখে হঠাৎ কেন যেন মনে হলো আল্লাহর ক্ষমা আর সন্তুষ্টির দ্বার এভাবেই হুড়মুড়িয়ে খুলে যাচ্ছে আজানের সাথে সাথে... ভিতরটা কি ভীষণ ভাবে দুলে উঠেছিল আমার!
এক একবার ঘড়ি ধরে দেখতাম, নামাজের আজান থেকে শুরু করে নামাজ শেষ করে বের হতে হতে কম পক্ষে এক ঘন্টা পার হয়ে যায়। অথচ, সময়টাকে মোটেও এক ঘন্টা মনে হতো না... নামাজের মধ্যে প্রতিটা মুহূর্তকে উপভোগ করতাম। তখন খুব অপরাধবোধ হতো... সিডনীতে নামাজের জন্য পাঁচ মিনিট বের করতে গেলেও মনে হয় কত সময়! কত কাজে দেরি হয়ে যাবে! নামাজ পিছাতে পিছাতে একেবারে শেষ মুহূর্তে পড়ি কত সময়! অথচ, ওখানে এক ঘন্টা কি সহজেই কেটে যেত... আজানের কথা বললাম, তেলওয়াতের কথা বলি নি। হুদাইফিয়া যে সময়টায় নামাজ পড়াতেন, তখন কি অদ্ভুত লাগত! এতদিন সিডিতে শুনে কেমন যেন ক্লীশেইড লাগত, অথচ যখন হুদাইফিয়া নামাজ পড়াচ্ছিলেন, কেবল একটা কণ্ঠ ছিলেন না, একজন জলজ্যান্ত, আবেগপূর্ণ মানুষ, আল্লাহর সামনে আর সবার মতই ভালনারেবল, তখন নামাজকে পুরাপুরি উপভোগ না করে উপায় আছে!

মক্কার দিনগুলোর যে দিকটা সবচেয়ে বেশি মিস করছি তা হচ্ছে-- নামাজ পড়াকে ঘিরেই দিনের আর সব কিছু ঠিক করা হতো... কখন খাব, কখন ঘুমাব, কখন ঘুম থেকে উঠব, কখন গোসল করব, কখন তাওয়াফ করব, কখন শপিঙে যাব... সব। সারা জীবন শুনে এসেছি একজন মুসলিমের জীবনের সব কিছু নামাজকে ঘিরে হয়... কিন্তু সত্যিকার ভাবে কখনও ওটা আমার জীবনে পাই নি এর আগে। এখন যখনই মনে হয়, তখনই খুব মিস করি অল্প কয়েকদিনের সেই জীবনটাকে...