Saturday, September 25, 2010

হৃদয়ের মাথা অথবা মাথার হৃদয় - ১




ইউনিভার্সিটি শুরুর সময়টা আমার খুব খারাপ যাচ্ছিল। নিজের ব্যক্তিগত জীবনে নানা টানাপোড়নে ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি নি। হুট করেই ঢুকে পড়েছিলাম একটা ইঞ্জিনিয়ারিং সাবজেক্টে। আমি ইঞ্জিনিয়ারিং টাইপের মেয়ে না। ওই একটা বছর আমার জঘন্য কেটেছে! রেজাল্ট খারাপ করেছি তো করেছিই (খারাপ মানে, ভীষওওওন খারাপ, ফেলও করেছি :((( ), এখনও পর্যন্ত কম্পিউটার ল্যাবগুলোর পাশ দিয়ে যেতে নিলে শিউরে উঠে, ওই কম্পিউটার ল্যাবগুলো ভীষণ অপছন্দ করি, ওখানকার গন্ধ অপছন্দ করি, ওখানকার রং অপছন্দ করি, বাতাস সহ্য করতে পারি না!

বুঝেছিলাম পালাতে হবে। কারণ আমি কিছু পছন্দ না করলে সেখানে আমি টিকতে পারি না। ইউনিভার্সিটির সাবজেক্ট লিস্টে দেখলাম 'নিউরোসাইন্স', তখন সেটাতেই অ্যাপ্লাই করে দিলাম। সাইকোলজিতে আমার বরাবর খুব আগ্রহ ছিল। আগ্রহের শুরু কবে, একেবারেই মনে নেই। মিসির আলী পড়তে পড়তে সেই আগ্রহ বাড়ত। কিন্তু মিসির আলী পড়ে মনে শান্তি আসতো না। কেমন একটা ভয় ভয় ভাবে ভরে যেত ভিতরটা। সব কিছুতেই বড় 'রহস্য'! অনেক বেশি দীর্ঘশ্বাস আর অসহায়ত্ব! মানুষের মন বড় 'রহস্যময়', রোগগুলো বড় 'রহস্যময়'! আমার এত রহস্য টহস্য ভালো লাগে না, কারণ জানতে আর বুঝতে ইচ্ছা করে। মানুষের শুধু শুধু একটা রোগ হবে, উল্টা পাল্টা কাজ কর্ম করবে, তার কোন কারণ থাকবে না?!

নিউরো+সাইন্স, রহস্যকে শুধু রহস্য বলে ফেলে না রেখে যেখানে রহস্যের সমাধানের চেষ্টা করা হয়। তিন বছর পড়লাম নিউরোসাইন্স। আমার জীবনের দারুণ তিনটা বছর। নিউরোসাইন্স অনেকগুলো ডিসিপ্লীনের সমন্বয়। একদিকে সাইকোলজি পড়ানো হচ্ছে, মাথার বিভিন্ন থিওরেটিক্যাল ফিলোসফি, অন্যদিকে অ্যানাটমি, যেখানে সব কিছু 'চোখে' দেখা যায়, একটা অসুস্থ মস্তিষ্ক আর সুস্থ মস্তিষ্কের পার্থক্য যেখানে স্পষ্ট। আবার ফিজিউলজি কিংবা ফার্মোকলজি, যেখানে শেখা যায় কি করে একটা ওষুধের মাধ্যমে মাথার নিয়ন্ত্রন বদলে দেয়া যায়! অনেকে, এমনকি ডাক্তাররাও যখন শুনতো নিউরোসাইন্স পড়ছি তখন খুব ঘাবড়ে যেত, এত কঠিন সাবজেক্ট পড়ছি! আমার কঠিন লাগতো না, কারণ আগ্রহ ছিল প্রচুর! আমি শুধু ক্লাসের পড়া পড়তাম না, নিউরোসাইন্সে নোবেল বিজয়ী এরিক ক্যান্ডেলের বই থেকে শুরু করে নিউরোসাইন্স নিয়ে লেখা নানারকম আধা-ফিকশন, নন-ফিকশন পড়তাম প্রায়েই। কিছু কিছু মানুষ আছে, যারা সারা জীবন ফার্স্ট হয়ে এসেছে। এরকম একজনের সাথে নিজে ঘর করি তাই যন্ত্রনাটা পুরাপুরি বুঝি… ওরা বুঝতে পারে না আমি কি করে ফার্স্ট ইয়ারের ফার্স্ট সেমিস্টারে অর্ধেক সাবজেক্টে ফেল করে আবার গ্র্যাজুয়েশনের সময় নিউরোসাইন্সের মত কঠিন সাবজেএক্টে এমন রেজাল্ট করলাম। কি করে বুঝাই পার্থক্য একটাই--নিউরোসাইন্স!

অনার্স থেকে রিসার্চ শুরু করলাম। রিসার্চ মানেই একটা ছোট ব্যাপার নিয়ে অনেক বড় করে ভাবা, গভীরে গিয়ে পড়াশোনা করা। মাস্টার্স করি নি, রেজাল্টের জন্য মাস্টার্স টপকে একবারে পিএইচডির সুযোগ পেয়েছি আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু এখন পিএইচডি করতে করতে মাঝে মাঝে আন্ডারগ্র্যাড খুব মিস করি। পিএইচডিতে আমাকে ছোট ছোট সব সূক্ষ্ম ব্যাপার স্যাপার নিয়ে ভাবতে হয়, আন্ডারগ্র্যাডে যেমন পুরা মাথাটা নিয়ে ভাবার সুযোগ পেতাম, সেরকম সুযোগ এখন কম আসে। তাই ভাবছি লিখে ফেলি যা জানি তা। মাঝে মাঝে পড়তে নিলে আন্ডারগ্র্যাডের সময়টুকুর কথা ভেবে খুব ভালো লাগবে!

নিউরোসাইন্সের মূল অ্যাপ্রোচ হচ্ছে, আমাদের ব্যবহার আর জ্ঞানের যে কোন পরিবর্তনের অর্থই হচ্ছে আমাদের মস্তিষ্ক বদলে গিয়েছে!

এটা যখন প্রথম আমার ভিতরে ঢুকেছে, তখন শিহরিত হয়েছিলাম খুব! আমরা যে কোন নতুন জিনিস শিখলেই আমাদের ব্রেইন বদলে যায়! যে কোন নতুন জিনিস!

প্রতিটা নতুন বই, প্রতিটা নতুন গান, প্রতিটা নতুন মুভ্যি, এমনকি আমার জীবনে আসা প্রত্যেকটা মানুষ আমার মাথায় "শারিরীক", "বাস্তব" পরিবর্তন ঘটিয়েছে! এটা কি অদ্ভূত একটা উপলব্ধি না? এক একজন ব্লগার, আপনাকে না ছুঁয়ে, না দেখেও আপনার একেবারে খুলির ভিতর ঢুকে শারিরীক পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়ে আসতে পারে?!

আমাদের প্রতিটা নতুন অভিজ্ঞতার ফলে আমাদের ব্রেইনে দুই ধরনের পরিবর্তন হতে পারে। একটা হচ্ছে, ব্রেইনে যেই 'কানেকশন' আছে, সেটা বদলে যাওয়া, অথবা, নতুন কোন 'কানেকশন' স্থাপিত হওয়া। কানেকশন বলতে এক বা একাধিক ব্রেইন সেলের মধ্যে সংযোগ বুঝাচ্ছি। ছবিতে ব্রেইনের কিছু 'কানেকশন'।





ধরুন আমাদের মাথা একটা পার্কের মত। পার্ক ভরা সবুজ ঘাস। আপনি যখন প্রথমবার সেই সবুজ পার্কের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় যাবেন, তখন সেখানে কিছু ঘাস দুমড়ে মুচড়ে যাবে। এরপর যদি কয়েক দিন যেখান দিয়ে আর না যান, তাহলে ঘাসগুলো আবার আগের জায়গায় ফিরে যাবে। কিন্তু এরপর প্রতিদিন সেই পথ দিয়ে হেঁটে দেখুন, আস্তে আস্তে পথটা স্পষ্ট হতে থাকবে এবং স্থায়ী হয়ে যাবে। প্রথমবার যদি পায়ে না হেঁটে মটরসাইকেল চালিয়ে যান, তাহলে সেই রাস্তাটা মোটামোটি স্থায়ী হয়ে যাবে! তাই অভিজ্ঞতাটা আসলে কি রকম, সেটার উপর নির্ভর করে কানেকশনটা কিরকম হবে।

আপনি ফেইসবুকে কারো নাম একবার দেখলেন, আপনার মাথায় একটা সেলের সাথে আরেকটা সেল কানেক্ট হবে। সাথে সাথেই খেয়াল করলেন সেই মানুষটা আপনার স্কুলের কোন বান্ধবীর কন্টাক্ট লিস্টে আছে, আপনার মাথায় আরেকটা কানেকশন স্থাপিত হবে। খেয়াল করলেন সেই মানুষটা আপনার পুরানো প্রেমিকার লিস্টে আছে! এবার হয়তো দশটা নতুন কথা মনে হয়ে যাবে, এবং দশটা কানেকশন স্থাপিত হবে! হালকা ভাবে দেখে গেলে যেখানে মানুষটার কথা মনে থাকতো না, এতগুলো কানেকশনের জন্য তাই আপনার মানুষটার কথা মনে থেকে যাবে।

যারা বিভিন্ন রকমের 'এডিকশনে' ভুগে, সেটা মদ হোক, ড্রাগ হোক, পর্ণ হোক, সিগারেট হোক, কিংবা দেবদাস টাইপের কোন স্যাডিস্টিক ভালোবাসা হোক, তৃতীয় পক্ষ হিসেবে নেশাগুলো দেখতে আমাদের খুব আজে বাজে ফালতু লাগে। মনে হয়, মনের জোর নেই কেন, সেটা থেকে উঠে আসতে পারছে না! কিন্তু আসল কারণ, তাদের মাথার ভিতর। এডিকশন একদিনে হয় না। প্রথমবার কেউ মদ খেলে, ড্রাগ নিলে বা পর্ণ দেখলে হালকা কানেকশন হয়, কিন্তু আস্তে আস্তে মদ, ড্রাগ, পর্ণ পর্যন্ত কানেশনকনটা গাঢ় হতে হতে একসময় হাইওয়ের মত হয়ে যায়! তখন মানুষ চেষ্টা করলেই সহজে উঠে আসতে পারে না। নিজের তৈরি করা সেই হাইওয়ের কাছে নিজেই খুব অসহায় হয়ে যায়! সেই হাইওয়ে ঢেকে ফেলার জন্য বা বদলে ফেলার জন্য দরকার সুদীর্ঘ দিনের অধ্যাবস্যায়। 'আনলার্নিং' জিনিসটা আসলেই কঠিন!

এটা পড়ার সময় আমার সব সময় মনে পড়তো সেই বাবা আর সন্তানের গল্প। ছেলেটার খুব রাগ ছিল, রাগ উঠলে মাথা ঠিক থাকতো না। বাবার কাছে যখন রাগ সমস্যা নিয়ে গেল, তখন তিনি একটা কাঠের টুকরো, কিছু পেরেক আর একটা হাতুড়ি দিয়ে বলেছিলেন, যখন প্রতিবার রাগ হবে, তখন অন্য কোন ভাবে রাগ প্রকাশ না করে কাঠের টুকরাটায় একটা করে পেরেক মারবে। ছেলেটা সূদীর্ঘ এক মাস কাঠের টুকরাটায় পেরেক মেরে গেল রাগ হতেই। কাঠের টুকরাটায় আর কোন জায়গা খালি ছিল না। পরের মাসে বাবা বললেন, প্রতিবার রাগ হলে একটা করে পেরেক তুলবে। ছেলে তাই করে গেল। মাস শেষে যখন বাবার কাছে আসলো, তখন বাবা বললেন, 'দেখো কাঠের টুকরাটা কি সুন্দর ছিল! তুমি প্রতিবার রাগ করেছো, আর এখানে পেরেক গেঁথে একটা করে ফুঁটা করেছো প্রথম মাসে। দ্বিতীয় মাসে তুমি শুধু পেরেক তুলেছো। তুমি যদি তখনও পেরেক গাঁথতে তাহলে এরকম আরও অনেক ফুঁটা তৈরি হতো।' গল্পের সারাংশে বলা ছিল, প্রতিবার রাগ করলে আমাদের হৃদয়ে সেরকম ফুঁটা তৈরি হয়!

ব্রেইন সম্পর্কে পড়ে বুঝলাম, এই পৌরনিক 'হৃদয়' আসলে মাথার ভিতর, আমাদের প্রতিটা ব্যবহারের ফলে মাথায় আসলেই বাস্তব পরিবর্তন হয়। এই পরিবর্তনগুলোর অনেকটুকুই হয়তো আমরা চাই না, ধুঁয়ে মুছে পরিবর্তন করে ফেলতে পারলে বাঁচি, কিন্তু আমরা যদি আমাদের ব্যবহার, উঠা বসার মানুষ, পড়ার বই, শোনার গান, দেখার মুভ্যি, ভাবার চিন্তা, অর্থ্যাৎ আমাদের আস্ত পরিবেশই পরিবর্তন করতে না পারি, তাহলে আমাদের ব্রেইনে আমাদের অনাকাংখিত পরিবর্তনগুলোই ঘটতে থাকবে অনবরত!




ছবি সূত্র ১


ছবি সূত্র ২

5 মন্তব্য:

রহস্য বালিকা said...

eto chomotkar ekta lekha! ektane pore fellam. nirghat ete amar besh kichhu "neuro-change" ghotechhe,:)
bohu din por ekta blog porlam jeta theke interesting kichhu jana gelo. thanks.
porer porbo ashuk inshallah porbo.

তারিক রিদওয়ান said...

সত্যিইইই আপু!!!!!!! এক্কেবারে আমার মনের কথাটাই বলেছেন, যে বিষয়ে আপনি আগ্রহ পাবেন সেটা যতই কঠিন হোক না কেনো তা অনেক সহজ হয়ে যায় শুধুমাত্র সেই বিষয়ে আগ্রহের কারণে.....

আর আমাদের মস্তিষ্কের ভিতর এই কানেকশানের কাহিনী আজকে আজই ১ম শুনলাম :-s

অসাধারণ লেখাটি শেয়ার করার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ :D

Lunatic poet said...

i have read all your writings . like

Anonymous said...

ধন্যবাদ পোষ্টার জন্য। আপনার সব লেখাই ভালো।
আপনি কি (বাঁধ ভাঙ্গার) ঊৎস এর নেট ঠিকানা জানেন?

maq said...

হু... ইঞ্জিনিয়ারিং আসলে খটমটে মানুষদের জন্য (আমি তাদের মধ্যে একজন!)... খটমটে মানুষ বলেই কী না কে জানে মনস্তত্ব বিষয়ক জিনিসগুলোকে খুব ভয় পাই। মানুষের মন নিয়ে গবেষণা করার চেয়ে যন্ত্রের ভেতর মন প্রোগ্রাম করে দেয়াটাই বরং সহজ মনে হয় মাঝে মাঝে...