
হজ্জ্ব কেমন হলো, সবার এ জিজ্ঞাসার জবাব এক কথায় দিচ্ছি--'আমাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়টুকু কাটিয়ে আসলাম।' ফিরেছি দুই সপ্তাহ হলো। প্রতিদিনই খুব ইচ্ছা করে বসে সব লিখা শুরু করতে। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়ের একটা মুহূর্তও ভুলতে ইচ্ছা করছে না, সে জন্যই লিখে ফেলার তাড়া। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমার সবচেয়ে বেশি লিখতে ইচ্ছা করছে হজ্জ্বের মূল ছয় দিন নিয়ে। পাঠকেরা হয়তো জানবেন, ওই ছয় দিন ছিল আমাদের এক মাসের হজ্জ্ব যাত্রার মোটামোটি মাঝামাঝি সময়ে ছিল। শুরুর কিছু কথা না বলে হুট করেই সেই ছয় দিনে যাওয়া যাচ্ছে না, তাই লেখাটাও শুরু হচ্ছে না।
আজকে জোর করে বসলাম লিখা শুরু করে দিতে। আমার হজ্জ্ব করার ইচ্ছাটা প্রথম কখন হয়েছিল? জীবনে একবার হজ্জ্ব ফরজ, হজ্জ্ব করতে মক্কায় যেতে হয়, তখন সেই কালো চারকোনা কাবাকে ঘিরে অনেক কিছু হয়, যেই কাবার ছবি ঘরের দেয়ালে দেয়ালে টানানো থাকে, যেই কাবার দিকে পা দিয়ে ঘুমানো যায় না--এসব তো ছোটবেলা থেকেই রক্তে, অস্থি, মজ্জায় ঢুকে গিয়েছে। বড় হয়ে যখন শুনেছি কাবার দিকে পা দিলে কিচ্ছু হয় না, তখনও দেখলাম ওদিকে পা দিয়ে শুতে পারি না, ভীষণ সংকোচ হয়, অস্বস্তি হয়। এ তো ভিতরে ঢুকে থাকা ভক্তি, কিন্তু কাবার জন্য বুকে ভালোবাসা ছিল কি? যেভাবে আমার বরাবর সাগর দেখতে ইচ্ছা করে, সেভাবে কাবা দেখার আকুতি ছিল কি? সত্যি বলতে, ছিল না।
কিন্তু, ভালোবাসা বা আকুতি যেমন ছিল না, তেমনি কখনও মনে হয় নি যে হজ্জ্ব করতে পারব না। মনে হতো, শেষ বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকলে মোটামোটি মধ্যবিত্ত সবাই-ই তো হজ্জ্ব করতে পারে। বুড়া তো হয়ে নেই! তারপর দেখা যাবে!
বুড়ো হওয়ার আগেই কাবা দেখার আকুতির প্রথম জন্ম হলো যখন সেকেন্ড/থার্ড ইয়ারে পড়ি। একদিন ইশি হুট করেই বললো ও হজ্জ্বে যাবে, তারপর ভাইয়াও দেখি এক বছরের নোটিশে টুকটাক টাকা জমিয়ে হজ্জ্ব করে ফেলল। আমি শেষ বয়সে যাদের হজ্জ্ব করতে দেখেছি, তাদের জীবনে সাদা দাড়ি আর মাথায় পট্টি ছাড়া তেমন কোন পরিবর্তন দেখি নি। কিন্তু ইশি আর ভাইয়ার জীবনে, ওদের জীবন দর্শনে, ব্যবহারে বেশ কিছু পরিবর্তন কাছাকাছি থেকে দেখে হঠাৎ করে তীব্র ইচ্ছা এসে গেল হজ্জ্ব করার। ততদিনে আমি ম্যালকম এক্স পড়েছি। পড়েছি হজ্জ্ব কি করে প্রচন্ড বর্ণবাদী একজন ম্যালকম এক্সকে মানবপ্রেমী বানিয়ে দেয়। মুহাম্মদ আসাদের রোড টু মক্কা পড়েছি, ইবনে বতুতার হজ্জ্বের উপর ডকুমেন্টারি দেখেছি, দেখেছি অল্প বয়সী অহংকারী ছেলেটা কি করে বিনয়ী আর প্রজ্ঞাবান হয়ে যায় হজ্জ্বযাত্রায়। পড়তে পড়তে মনে হলো, কেউ সত্যি সত্যি হজ্জ্ব করতে পারলে এরকম আত্মশুদ্ধির অন্তর্যাত্রা পৃথিবীতে বেশি নেই! তখন থেকেই ছোট বেলায় যেই কাবার ছবি দিনে পাঁচবার আজানের সাথে দেখতে দেখতে 'ক্লীশেইড' মনে হতো, যেই হজ্জ্বকে বুড়ো মানুষের প্ল্যানড রুটিনের অংশ মনে হতো, সেই হজ্জ্বে যাওয়ার তীব্র আকুতি ভিতরে এসে ঢুকেছিল। ভাইয়াকে বললাম, 'দেখো আমার টাকা নেই, মাহরাম নেই, কিন্তু এক্ষুনি হজ্জ্ব করতে ইচ্ছা করছে!' ও বললো, 'আপু, তুমি নিয়ত করে ফেলো, দেখবে আল্লাহ কোথা থেকে ব্যবস্থা করে দিবে, তুমি নিজেই অবাক হয়ে যাবে!'
নিয়ত করে ফেলেছিলাম তখনই, সুযোগ পেলেই হজ্জ্বে যাব ইনশাআল্লাহ।
এখন বুঝতে পারছি, ভাইয়ার কথায় সবটুকু সত্যতা ছিল! তখনও আমার ইউনির ট্রান্সক্রিপ্টের অবস্থা ভালো না। তার অল্প কিছুদিন পরেই বিয়ে করলাম ১০০% খাঁটি স্টুডেন্ট মানুষ নওকে। বিয়ের কথা বার্তা হওয়ার সময় আমার একটা কাজিন এসে বলেছিল, নও তো সরকারী ইন্টার্নশিপ করছে। তুই বিদেশ থাকিস বলে হয়তো জানিস না, ওদের মাসিক বেতন ২০০০ এর বেশি হবে না (ঘটনা ঠিক না, বেতন আরিকটু বেশি ছিল!)। তোকে কিন্তু দুই টাকার চানাচুরও কিনে খাওয়াতে পারবে না! রেডি থাকতে হবে তো!
আমি সেসব জেনেশুনেই বিয়ে করেছি। বিয়ে করেছি এতটা কম মোহরানায়, যেটা খাঁটি স্টুডেন্ট মানুষটাও দেড় বছরের মাথায় পুরাপুরি পরিশোধ করে দিতে পেরেছিল!
সব দিক মিলিয়ে অন্য কেউ কেন, নিজেও ভাবি নি, বিয়ের দুই বছর পার না হতেই হজ্জ্ব করে ফেলব। এখন আমি যেখানে দাঁড়িয়ে সেখানে এসে বুঝতে পারছি, আল্লাহ, একমাত্র আল্লাহ আমাদের জন্য সুযোগ এনে দিয়েছেন। শুনে অনেকেই বিশ্বাস করতে চায় নি, কিন্তু সত্যি সত্যিই আমরা নিজেদের ১০০% হালাল উপার্জন থেকে হজ্জ্ব করে আসলাম আলহামদুলিল্লাহ। আমরা দু'জনেই মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়ে। তাই পারিবারিক সূত্রে বা অন্য কোন সূত্রে কারও অনুদানের অংশ পাই নি, আল্লাহ ছাড়া কারোও অনুগ্রহ নেই নি!
নিজের ক্ষেত্রে হয়েছে, তাই এখন সত্যি সত্যি জানি, হজ্জ্বে যেতে হলে শুধু সত্যিকার ভাবে ইচ্ছাটা দরকার আর আল্লাহকে সেই ইচ্ছাটা জানিয়ে সাহায্য চাওয়া দরকার। তারপর আল্লাহ কোন না কোন ভাবে ব্যবস্থা করে দিবেনই!
তবে একটা কথা সত্যি যে দেশে টাকা জমানো আর দেশের বাইরে টাকা জমানোতে তফাৎ প্রচুর। ন্যাডু, ইউনিভার্সিটি ডিগ্রী শেষ করার আগেই শুধু মাত্র রিটেইল দোকানে চাকরি করে টাকা জমিয়ে ব্যাংকের লোন দিয়ে বাড়ি কেনার চিন্তা করছে। পিরানা আপু মাত্র চাকরি শুরু করে ব্র্যান্ড নিউ গাড়ি নিজে কিনল, ওর আব্বু আম্মুকে গাড়ি গিফট করলো, ফিজিতে গিয়ে ছুটি কাটিয়ে আসল, কত কিছু। তবে অবশ্যই এখানে উপার্জন যেরকম, খরচও তেমন, তাই দেশে যে মধ্যবিত্ত, এখানেও সে তা-ই। হজ্জ্বের কথাটা যেহেতু মাথায় আগে থেকেই ছিল, তাই দু'জনেই ঠিক করে খরচগুলো যতটা সম্ভব কমিয়ে এনেছিলাম। তারপর কিছু কিছু প্ল্যানিং। আমার সুপারভাইজার ভীষণ ভালো মানুষ, তারপরেও সারা বছর একটু অতিরিক্ত চেষ্টা করেছিলাম ওনাকে খুশি রাখতে। ছুটি চাইলে যেন না করতে না পারে! নও এর একটা পরীক্ষা দেয়ার কথা ছিল জানুয়ারী ২০১১ তে। কিন্তু হজ্জ্বে গেলে তো এক মাস কোন পড়াশোনা হবে না! শেষে বেচারা নভেম্বরে হজ্জ্ব করতে সেই পরীক্ষা দিল সেপ্টেম্বর ২০১০ এ, মাত্র দুই মাসের প্রিপারেশনে। যেখানে ভাইয়া আপুদের দেখি এক বছর পড়েও পাশ ফেলের টানাটানিতে থাকতে, সেখানে ও মাত্র দুই মাসের প্রিপারেশনে শুধু পাশ করে নি, বেশ ভালো রেজাল্টও করে ফেলল। তখন আবারও মনে হলো, হজ্জ্বের নিয়তেরও বরকত আছে সত্যি!
----
3 মন্তব্য:
inspired.
কে বলে আল্লাহর কাছে চাইলে পাওয়া যায় না? আমি তো বলি, আল্লাহর কাছে চাইলে সবই পাওয়া যায়, শুধু চাওয়ার মতো করে চাইতে হয়!
নূরে আলম, ঠিক সেটাই!
Post a Comment