Saturday, December 18, 2010

হৃদয়ের পথে ২: প্রস্তুতি পর্ব এক


মা বাবা হজ করেছিল একসাথে জীবনের প্রথম দিকে, বাবার পিএইচডি স্কলারশিপের জমানো টাকায়। আমি হজে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর মা বার বার বলছিল, 'মা ভালো করে পড়াশোনা করে হজে যাও। অল্প বয়সের কারণে প্রথম হজে খুব একসাইটেড ছিলাম, কিন্তু তেমন পড়াশোনা করে যাই নি। অনেক কিছুই বুঝি নি। সে জন্য খুব অনুশোচনা হয়।'

রিমা যখন জানলো আমি হজে যাবো, তখন ও-ও একই কথা বললো। 'ভালো করে পড়াশোনা করে যাও!' বললো, 'মিনার ছয়টা দিন হচ্ছে হজের সবচেয়ে কঠিন সময়। আমার পুরাটা সময় ভালোই কেটেছিল, কিন্তু ওই কয়েকটা দিন আসল পরীক্ষা হয়েছে। একটা সময়ের পর আর পারছিলাম না, প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল কখন নিজের ঘরে, নিজেস্ব আরামে ফিরে যাবো। অনেকের ব্যবহারই মানতে পারছিলাম না। এখন বুঝি, ভালো করে পড়াশোনা করে গেলে ওরকম হতো না! আমাদের মনেরও ট্রেনিং দরকার। যাওয়ার আগে অন্তত: দু' সপ্তাহ বেশি করে আল্লাহর ইবাদত করো, যেন ওখানে গিয়ে মনকে তৈরি করতে কষ্ট না লাগে।'

রিমার কথা শুনে ভয় লাগলো। নামাযে দাঁড়িয়ে তো সবারই কোন না কোন সময় এরকম মনে হয়--কখন নামায শেষ হবে, কত কাজ! কিংবা রোজা রাখতে গিয়ে ইফতারের জন্য অপেক্ষা। কিন্তু হজ করতে গিয়েও মানুষের বিরক্ত লাগা শুরু হয়! সময় গোণা শুরু হয়! অনেক দিন ধরে জমানো পুঁজি আর স্বপ্নের হজে গিয়ে তারপরে বিরক্তি শুরু হলে তো নিজেকেই মাফ করতে পারার কথা না! কিন্তু সত্যিই তো, আবেগ মানুষকে কতক্ষন তাড়িয়ে বেড়াবে, প্রশিক্ষনের মাধ্যমে আবেগের সাথে জ্ঞান যদি মিশারই সুযোগ না পায়, তাহলে তো মন একসময় না একসময় উঠে যাবেই।

খেয়াল করলাম, মা বা রিমা নিজেদের হজ অভিজ্ঞতার এই দিকগুলো আগে সেভাবে বলে নি। ওদের এই অভিজ্ঞতা হয়েছিল বলে অন্য মানুষেরও নিশ্চয় হয়। কিন্তু অন্য কারো থেকেই শুনি নি আগে। হজ সম্পর্কে যত কিছু পড়েছি, দেখেছি তাতে আমার ধারণা হয়ে গিয়েছিল হজ খুব ম্যাজিকেল কিছু হবে, ওখানে গেলে সবাই স্বয়ংক্রিয় ভাবেই তীব্র আবেগে ভেসে থাকে সারাক্ষন, সব্বাই খুব ভালো হয়ে যায়। কিন্তু আসলে তা না?!!! এরা আমার কাছের মানুষ বলে তাও আমি হজে যাওয়ার আগে সাবধান করেছিল আমাকে। কিন্তু সবার কি হজে যাওয়ার আগে জানে এই হজের বাস্তবতা সম্পর্কে? মনে হয় না!

পড়াশোনা শুরু করার প্রথম দিকে পিএইচডির কাজের ফাঁকে ফাঁকে অনলাইনে সার্চ করতাম হজ নিয়ে। ইংরেজি প্রচুর ম্যাটেরিয়াল পেয়েছি ইউটিউবে, মুসলিম ম্যাটারসে, ইসলাম অনলাইনে, এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ব্লগে। কিন্তু বাংলায় 'হজ', 'হজ্জ্ব', 'হজ্ব', হজের সবগুলো বানানের সার্চ দিয়ে অবাক হয়ে একটা ব্যপার খেয়াল করলাম। ইন্টারনেটে বাংলায় হজ সম্পর্কে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা খুব অল্প, আর ব্যক্তিগত মতামত যা আছে, তার বেশির ভাগই ভীষণ রকমের নেগেটিভ! এই ইমব্যালেন্সে বেশ অবাক হলাম। যেই দেশ থেকে নব্বই হাজার হাজী হজ করতে যায়, প্রতি বছর এমন কোন মানুষ পাওয়া যাবে না যার পরিচিত অন্তত: একজন মানুষ হজে যাচ্ছে না, সেই দেশে কি সত্যিই হজ নিয়ে এত নেগেটিভ ফিলিংস? নাকি ইন্টারনেটে হজ নিয়ে ঋনাত্মক কথা বলা মানুষদের বকাবাজি বেশি?

ঋনাত্মক কথাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বলা দু'টো পয়েন্ট হচ্ছে, এত টাকা দিয়ে হজ না করে এই টাকা গরীবদের দিয়ে দিলে বেশি ইসলাম পালন হবে। আর সৌদিদের এত টাকা কেন দিব?

এর মধ্যে প্রথম পয়েন্টটা সিডনীতেও একটা আংকেলকে বলতে শুনতাম খুব। কিন্তু পাত্তা দেয়া বন্ধ করে দিলাম যখন দেখলাম আংকেল হজে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় টাকার চারগুণ (৪/৫ বছর আগে, বিশ হাজার ডলার) নগদ দিয়ে (ব্যাংক লোন নিয়ে না!) ব্র্যান্ড নিউ গাড়ি কিনলেন। সত্যিই হাসি পেল যখন দেখলাম এরকম আবেগপ্রবন যুক্তি দিয়ে ভাসিয়ে দেয়া একজন সাংবাদিক ব্লগার বউকে নিয়ে বাংলাদেশ থেকে মালয়শিয়ায় রিজোর্ট ভাড়া করে হলিডে করে ফেইসবুকে ছবি আপলোড করলেন। বুঝলাম, এই যুক্তিগুলো দেয়া সহজ, কিন্তু আসলে বাস্তবতা হচ্ছে, টাকা নিজের কাছে বসে থাকে না। টাকা থাকলে মানুষ সেটাকে কোন না কোন জায়গায় ইনভেস্ট করেই, সব জমানো টাকা গরীবদের হতে তুলে দেয় সে রকম মহৎ মানুষেরা বইয়ে আছে, বাস্তবে খুব অল্প! অথচ এই যুক্তি দেয়ার মানুষ বইয়ের বাইরেই বেশি! দেশে অনেককেই বলতে শুনি, রাস্তায় রাস্তায় ফকিরদের টাকা দেয়ার চেয়ে টাকাগুলো একসাথে জমিয়ে গরীবদের কোন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলে বেশি উপকার হবে। কিন্তু ওদের কথা শোনা বন্ধ করে দেই যখন দেখি এই যুক্তি দিয়ে ফকিরদের দূর দূর করে দিয়েই সেই টাকা দিয়ে সিগারেট কিনে খায়, কিংবা তার একশ' গুণ বেশি দিয়ে দুপুরের খাবার! টাকাগুলো জমিয়ে সেগুলো দিয়ে কাউকে রিকশা কিনে দেয়ার নামগন্ধও দেখতে পাই না।

বুঝি এগুলো নিজেকে বোকা বানানোর রাস্তা শুধু! গরীবদের দেয়ার ইচ্ছা থাকলে হজ করেও দেয়া যায়, রাস্তায় ঘুরতে থাকা একজন ফকিরকে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করেও আরেকজনকে রিকশা কিনে দেয়া যায়। দরকার শুধু নিজের ভিতরে সত্যিকার ভাবে তাকানো!

আর দ্বিতীয় যুক্তি? সৌদিদের কেন টাকা দিব? সত্যি বলতে কি সৌদিদের আমারও টাকা দিতে ইচ্ছা করে না। তাই এই প্রশ্নের সরাসরি জবাব আমার কাছে ছিল না। উত্তর পেলাম আবদুদ্দাইন মুহাম্মদ ইউনুছের 'ইসলামে হজ্জ ও ওমরাহ' নামের বইটা পড়তে গিয়ে। পাঁচশ+ পৃষ্ঠার মোটকা বইটা ইন্টারেস্টিং, কারণ কাবা থেকে শুরু করে হজ্জ্বের পুরাটুকুরই বিস্তারিত ইতিহাস, এবং সাথে সাথে বিভিন্ন মাযহাবের সবগুলো মত দেয়া। পড়লে হজ্জ্বের বেশ পরিপূর্ণ একটা চেহারা পাওয়া যায়। সেই বই থেকে প্রথম জানলাম ইসলামে হজ ফরজ হয়েছে ৮ম হিজরীতে (কারও কারও মতে আরও আগে)। কিন্তু তখনও কাবার দেখাশোনা করত পৌত্তলিকরা, কাবা ভর্তি তখন নানা দেবদেবীর মূর্তি, পৌত্তলিকেরা নগ্ন হয়ে কাবার চারপাশে তাওয়াফ করত, পশু বলি দিয়ে তার রক্ত কাবার দেয়ালে মেখে রাখত, এবং সবশেষে কাবায় তীর্থে আসা মানুষদের থেকে টাকা নিয়ে পৌত্তলিকরা লাভবান হত। এরকম বিচ্ছিরি পরিস্থিতিতেও হজ ফরজ হয়েছিল এবং রাসুল (সা) আবু বকরের নের্তৃত্বে মুসলিমদের হজে পাঠিয়েছিলেন! আল্লাহর রাসুলের বুদ্ধি আর বিশ্বাস নিশ্চয়ই এখনকার ব্লগারদের চেয়ে বেশি ছিল! আরবের শেখরা আর যাই হোক, সেই সময়ের পৌত্তলিকদের চেয়ে তো কাবার দেখাশোনা ভালো করে করছে!

সবচেয়ে বড় কথা হলো,

"আল্লাহর ঘর পর্যন্ত পৌঁছাবার সামর্থ্য যার আছে, হজ করা তার উপর আল্লাহর অনিবার্য একটা অধিকার।" (সূরা আল ইমরান: ৯৭)

আমার নিজের কুরআন পড়ার অভিজ্ঞতায় আল্লাহ এভাবে স্পষ্ট করে নিজের অধিকার বলে ঘোষনা করেছেন খুব অল্প জিনিসকেই। এরপরেও তর্ক করব? আমার সাহস নেই! :(


--------

1 মন্তব্য:

Mahmud said...

Jajakallah. Nice work...