Monday, December 27, 2010

হৃদয়ের পথে ৪: প্রথম দৃষ্টি

আবু ধাবিতে আমাদের পাঁচ ঘন্টার স্টপ ওভার ছিল। ওখানেই ইহরাম পরতে হলো। ইহরাম পরার সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা হচ্ছে নামাজের ঘর। নামাজের ঘরেই বাতুল আন্টি আর আংকেলের সাথে পরিচয়। লেবানীজ, পঞ্চাশোর্ধ যুগল। আংকেলকে দেখেই বুঝা যায়, সব কিছু স্বাভাবিক নেই। চেহারায় কেমন জলে পড়া ভাব। হাঁটা শুরু করলে বুঝা যায়, শারিরীক সমস্যাও আছে। ডান পা টেনে টেনে হাঁটেন, আর ডান হাত একদম নাড়ান না। ইহরাম পরার পরে মনে হচ্ছিল ছোট একটা বাচ্চা বড়দের পাঞ্চাবী পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এখনই উল্টে পরে যাবে। আন্টি বললেন, আংকেলের পর পর দুইটা স্ট্রোক হয়েছিল, ৩৫ বছর বয়সে। আশির দশকের শেষের দিকে। তখন থেকেই এই অবস্থা। বয়স কম দেখে অনেকটুকুই রিকভার করেছেন, কিন্তু কখনও স্বাভবিক হন নি। কথা বলতে পারেন না, ইশারায় বুঝিয়ে দেন, যার পুরাটুকুই আন্টি বুঝেন, আমরা তেমন বুঝতে পারি নি। ভীষণ অবাক হলাম, যখন আন্টি বললেন, ওঁরা দুইজন একা একা হজে এসেছেন, ছেলে এখন ব্যস্ত, টাকা দিয়েছে হজের জন্য, কিন্তু সাথে আসলো না। এয়ারপোর্টে বোর্ডিং গেইটের সামনে দেখলাম আন্টির হাতে অন্তত: চোদ্দটা বিভিন্ন সাইজের ব্যাগ, কোনটা হাতে ঝুলানো, কোনটা কাঁধে, কোনটা বাঁ হাতের কড়ে আঙ্গুল দিয়ে কোন রকমের আটকে রাখা। আংকেল নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত, তারপরেও পুরুষত্ব বোধ থেকেই হয়তো, মাঝে মাঝে আন্টির থেকে এটা সেটা নিতে চান, কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ফর্সা মুখ লাল হয়ে যায়, হাঁপাতে থাকেন। আমি আর নও, দু'জনেই হালকা ব্যাগ নিয়েছিলাম, হজে আবার তেমন কি নিব? খুব সহজেই আন্টি আংকেলের কিছু ব্যাগ আমরা নিতে পারলাম সেই হোটেল পর্যন্ত। এরপরেও বিভিন্ন সময়ে এখানে সেখানে যেতে হাতের কিছু ব্যাগ শেয়ার করেছি, কখনও আন্টি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন, কখনও আংকেল উষ্ঠা খেয়ে পরে গিয়েছেন কাবায়, তাতে পা ফুলিয়ে ফেলেছেন, কখনও খুব অল্পতেই টায়ার্ড হয়ে যাচ্ছেন, কখনও বুঝে উঠতে পারছেন না কখন, কিভাবে তাওয়াফ করবেন। নও ডাক্তার শোনার পর থেকে প্রথমেই আমাদের ফোন করতেন। যেতাম আমরা, তেমন কিছুই করার ছিল না, শুধু কিছুক্ষন কথা বলতাম, কথা শুনতাম। ব্যাস, এই সামান্যতেই কি যে যাদু হয়ে গেল! মদীনায়, আজিজিয়ায়, মিনায়, যেখানেই আন্টি আংকেলের সাথে দেখা হয়েছে, আন্টি আমাকে জড়িয়ে ধরেছেন। আংকেলের সরল মুখে ভীষণ বোকা, কিন্তু একশ ভাগ বিশুদ্ধ আনন্দের হাসিতে ভরে যেত, ঠিক সেখানে দাঁড়িয়েই নওকে একটা এক মিনিটব্যাপী লম্বা স্যালুট দিতেন।

মনে পড়লো ইসমাইল ডেভিসের আরেকটা কথা--হজে এমন অনেকের সাথে বন্ধুত্ব হবে, যা সারাজীবন মনে থাকবে। বাতুল আন্টি, আংকেল জীবনের ভীষণ অন্যরকম একটা অর্থ দেখিয়ে দিলেন। আংকেলের নিজেস্ব কষ্টবোধ আছে। নিজের শরীর নিয়েই বিব্রত, মানুষকে নিজের কথা বোঝাতে পারেন না সেই কষ্ট। বউ সমস্ত বোঝা বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে, তিনি নিজের ইহরাম সামলেই আগাতে পারছেন না, নুপংশুক হয়ে থাকার সেই নিদারুণ কষ্ট। কিন্তু আন্টির কষ্টগুলো? ফিরার সময় জেদ্দা এয়ারপোর্টের ছোট্ট একটা দৃশ্য ভীষণ ভাবে গেঁথে গেল মনে। আমি আর নও লাগেজ জমা দিয়ে এয়ারপোর্টে ঘুরতে বের হয়েছি, তখনই দেখলাম আন্টিকে। একটা সোনার গয়নার দোকানে আন্টি একা একা দাঁড়িয়ে খুব মনযোগ দিয়ে কাঁচের ভিতরের গয়নাগুলো দেখছেন। সেই একটা দৃশ্য এত কিছু বলে দিল, এত কিছু!

ফিরে আসি হজের কথায়... বাতুল আন্টি আংকেল ছাড়াও আমাদের গ্রুপে বেশির ভাগই ছিলেন বয়স্ক মানুষ। আমাদের হজ গ্রুপ থেকে পাঁচশ হাজী গিয়েছিলেন, কিন্তু আমরা গিয়েছিলাম সবচেয়ে আগে, আর ফিরেছি সবচেয়ে পরে। এত সময় মনে হয় শুধু বুড়া বুড়িদেরই থাকে! সেজন্যই, আমরা পড়ে গিয়েছিলাম বুড়া বুড়িদের গ্রুপে। হজের একদম শুরুতে এই বুড়া বুড়ির গ্রুপটায় পড়ায় খুব ভালো হলো, নিজেদের এত হালকা, সুস্থ, এফিশিয়েন্ট মনে হলো! আমাদের গুণ না, বয়সের গুণ!

সেই ফিলিংসটা কিছুটা কাল হলো। হোটেলে গেলাম রাত তিনটায়। ফজর পাঁচটায়। আমাদের গ্রুপ লীডার সবাইকে নিয়ে উমরাহ করবেন ফজরের পরে। কিন্তু ওই যে, নিজেদের এত হালকা মনে হচ্ছিল! চব্বিশ ঘন্টার উপরে জার্নি করেছি, জেদ্দা থেকে মক্কায় আসতে দশ ঘন্টা লেগেছে, তাতে কি? আমরা তো কম বয়সীই আছি! ঠিক করেছি ফজরের আগেই উমরাহ করব। কাবার এত কাছে এসে কাবা দেখতে যাব না?! গেলামও।

মসজিদের যত কাছে যাচ্ছিলাম, ততই অদ্ভূত অনুভূতি হচ্ছিল। আমি সত্যিই এখানে? ওই যে বললাম, যাওয়ার আগে কয়েক দিন খুব ব্যস্ত ছিলাম, প্রিপারেশন ছিল না, ঘুম ছিল না, সব মিলিয়ে শারিরীক ক্লান্তি লাগছিল, কিন্তু উত্তেজনায় বুঝতে পারছিলাম না।মসজিদের বাইরে দাঁড়িয়ে শিখলাম মসজিদে ঢুকার দোআ! মেয়ে বলে কখনও ওভাবে শিখা হয় নি। দোআ শিখতে গিয়ে নিজেকে খুব অপ্রস্তুত মনে হচ্ছিল। তারপর আস্তে আস্তে আগালাম কাবার দিকে। আমার ধারণা ছিল দরজা থেকে কাবা অনেক দূরে হবে। কিন্তু ওই যে ওখানেই কালো গিলাফ দেখা যাচ্ছিল! আমরা প্রথম কাবা দেখেলাম রুকন ইয়ামিনের কোনা থেকে।

প্রথম ছবিটা দিনের বেলায় তোলা, কিন্তু কাবার ঠিক এদিকটাই আমি প্রথম দেখেছিলাম, রুকন ইয়ামীনের দিক। দ্বিতীয় ছবিটার রং এবং আলোগুলো আমার প্রথম দেখা রং এবং আলো, চোখ বুজলেই দেখতে পাই। দু'টোই দিলাম আশিকুলের ফ্লীকার থেকে।

প্রথম দেখায় কাবাকে খুব বড় মনে হলো, অন্তত: পাঁচ তলা সমান হবে মনে হয়। ছবিতে দেখে এত পিচকি লাগে কেন? আর কাবার চারপাশের তাওয়াফ করার সাদা জায়গাটাকে খুব ছোট মনে হলো। আর অনুভূতি? সেই প্রাচীন কালো ঘর, যা বিশ্বের প্রাচীনতম উপাসনালয়, তার চারদিকে হাজার হাজার মানুষ সব ভুলে ঘুরছে তো ঘুরছে। সেই দৃশ্যটা দেখে কার চোখ শুকনা থাকে? ব্যাখ্যা করতে পারছি না, কিন্তু এখনও ঠিক সেরকম ইমোশনাল ফীল করছি। কেমন এক মিশ্র অনুভূতি, অপ্রস্তুত ভাব, বিষ্ময় বোধ, ছোটবেলা থেকে দেখে আসা সব ছবি-ভিডিওর সাথে বাস্তবতা মিলানোর প্রানান্তকর চেষ্টা, এক সাথে সব কিছু দেখে ফেলার চেষ্টা, কাবা, কাবার গিলাফ, মানুষগুলো, আশে পাশের আলোয় উদ্ভাসিত মসজিদের অংশগুলো, কত কিছু দেখার আছে! আর সব, স-অ-ব ছাপানো প্রবল কৃতজ্ঞতাবোধ…

4 মন্তব্য:

Anonymous said...

অনেক ভাল লেগেছে। :)

Anonymous said...

lafiye eshe porlam.. Ismail Devis ar hadith boi er link ref gula ulte palte dekhchi gelo shopta dhore..
lok utshaho eto kom keno!
porer porber protikkhay. -anon.

Ibn Shahid said...

salam

Ibn Shahid said...

salam