
যাক পড়াশোনায় ফিরে যাই--আবদুদ্দাইন মুহাম্মদ ইউনুছের বইটার পাশাপাশি পড়লাম ইসমাইল ডেভিসের বই 'গেটিঙ দ্যা বেস্ট আউট অফ হজ্জ্ব'। অনেকের মুখে শুনেছি বইটার কথা, পড়া শুরু করে বুঝেছি বইটা সত্যিই ভীষণ অন্যরকম। ইসমাইল ডেভিসের বয়স বেশি হবে না, বড় জোর হয়তো পঞ্চাশ। কিন্তু ৮৭ সাল থেকে শুরু করে মোটামোটি ২০ বারের মত হজ্জ্ব করেছেন। যদিও তিনি অস্ট্রেলিয়ান কিন্তু মদীনায় একটা লম্বা সময় ছিলেন বলেই এই সুযোগ পেয়েছেন। একেকবার একেক অভিজ্ঞতা। সে সব অভিজ্ঞতার সমন্বয়েই লেখা বইটা। প্রতিটা চাপটারে ফিকহের পাশাপাশি প্র্যাকটিকেল টিপস। একেবারে হজ্জ্বের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, হোটেলগুলোতে অভিজ্ঞতা কেমন হবে, ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম কি রকম, শাটল বাসগুলো ঘুরে আসতে কত সময় লাগে, তাওয়াফে কোন সময়টা ফাঁকা থাকে, জামারাতে পাথর ছোঁড়ার জন্য ভিড় সবচেয়ে কম থাকে কোন সময়ে, মিনায় কোন সাইজের ব্যাগ নিতে হবে, ব্যাগে কি কি থাকা লাগবে, কোথায় কি রকম খাবার পাওয়া যাবে, টাকা ভাঙাতে হবে কোথা থেকে, ফোনে কি ধরণের সিম ব্যবহার করতে হবে, কি না নেই! চারশ পৃষ্ঠার বইটা দুইবার পড়লাম আগা থেকে গোড়া, এবং ভীষণ রকমের উপকৃত হয়েছি।
সাধারনত হজ নিয়ে বলা মানুষেরা ভীষণ গম্ভীর থাকে, কিন্তু ইসমাইল ডেভিসের লেকচারে (ফ্রি লেকচার দেন ইসমাইল সিডনীতে, ইংল্যান্ডে এবং আরও কিছু দেশে মনে হয়!)। কিছুক্ষন পর পর হাসতে হয়। হাসতে হাসতে ব্যাপারগুলো ভীষণ ভাবে ভিতরে ঢুকে যায়, আর ভুলাভুলি নেই! উদাহরন দেই--রাসুল (সা) কখনও রুকন ইয়ামেনী আর হাজরে আসওয়াদ--কাবার চার কোণার মধ্যে মাত্র দুই কোণা ছাড়া অন্য কোন কোণা হাত দিয়ে ছুঁয়েছেন বলে কোন বর্ণনা নেই। কিন্তু অনেকে মনে করেন কাবা ধরলেই পূন্য, কাবার যে কোন দেয়ালে জায়নামাজ ঘষেন, চুমু দেন, জড়িয়ে ধরে বসে থাকেন। মাকামে ইবরাহীম নিয়েও একই কান্ড। ব্যাপারটা যখন আবেগ থেকে করা হয়, তখন হয়তো ক্ষতি নেই, কিন্তু মানুষ যখন পূণ্যের আশায় নিজের মনের মত কাজ শুরু করে, তখনই সমস্যা। সে জন্যই ইসমাইল ডেভিস আমাদের শক্ত করে বলে দিলেন,
'মনে রাখবে, নো টাচিং, নো কিসিং, নো রাবিং।
একসেপ্ট হোয়েন য়ু আর ইন য়ুর হোটেল রুম।
এন্ড, নট ইন ইহরাম।'
সবাই হেসে ফেলল। সেই যে ঢুকে গেল মাথায়, পরে মাকামে ইবরাহীমের একেবারে পাশ দিয়ে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল বেশ কয়েকবার, হাজরে আসওয়াদ আর রুকন ইয়েমিন ছাড়া অন্য দিকগুলো ধরার সুযোগ এসেছিল, কিন্তু ধরি নি। ওই যে, 'নো টাচিং, নো কিসিং, নো রাবিং!'
আরেকটা ব্যাপার ভীষণ ভালো লেগেছিল ইসমাইল ডেভিডস সম্পর্কে, ইসমাইল ডেভিডসের সততা আর স্পষ্টভাষিতা। বলেছিলেন মনে আছে, 'হজে গিয়ে শকড হবে না খবরদার, তুমি মনে করো সবাই আল্লাহর জন্য হজের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে তোমার জন্য? না, যারা হজের ব্যবস্থা করছে তোমাদের জন্য, তাদের ৯০% মানুষ টাকার জন্য ব্যবসা করছে। কিন্তু এটা নিয়ে তোমার কিছুই করার নেই। তুমি শুধু তোমার দায়িত্বটুকু পালন করবে।' বলেছিলেন, 'হজ দুই থেকে তিন মিলিয়ন মানুষ যায়, কিন্তু দিস ইজ দ্যা মোস্ট ইনডিভিজুয়াল জার্নি এভার।' এ কথাটার অর্থ বুঝেছিলাম পরে... হজ করতে গিয়ে! এগুলো ছাড়াও হজ সম্পর্কে বেশ কিছু অসাধারন অর্ন্ত:দৃষ্টি দিয়েছিলেন, বলেছিলেন বার বার, এগুলো উপলব্ধি করবে হজ করতে গিয়ে। করেছিলামও। হজের মূল লেখাটায় মাঝে মাঝেই তাই ইসমাইল ডেভিসের বইয়ের রেফারেন্স চলে আসবে।
সূরা হজ পড়ার উপদেশ প্রথম পেয়েছি ইসমাইল ডেভিসের কোর্সে, যেটা অন্য কোথাও থেকে শুনি নি, পড়ি নি! তিনি বার বার বললেন, 'সূরা হজ পড়, দেখবে, আল্লাহ সূরা হজে অর্ধেকটা জুড়ে শুধু আখিরাতের কথা বলেছেন। কেন? ভাবো, ভাবতে থাকো, হজ করতে গিয়ে উত্তর খুঁজে পাবে!' উত্তর খুঁজে পেয়েছিলাম, সেটা পরে বলছি।
তারপর আমার কুরআনের ইনডেক্স ধরে ধরে হজের উল্লেখ করা আয়াতগুলো পড়লাম (২:১৫৮, ২:১৮৯, ২:১৯৬-২০৩, ৩:৯৭, ৫:২ এবং সূরা হজ), কাবা উল্লেখ করা আয়াতগুলো পড়লাম। আর বুলুগ আল মারাম থেকে হজ সম্পর্কে সবগুলো হাদীস পড়লাম। রাসুল (সা) জীবনে একবারই হজ করেছেন, তাই নামায সম্পর্কিত হাদীসগুলোর মত হজ সম্পর্কে হাদীসগুলো এত কনফিউজিং না। পড়লে হজ সম্পর্কে বেশ সামষ্টিক একটা চিত্র পাওয়া যায়।
ইসমাইল ডেভিস আরেকটা কাজ করতে বলেছিলেন। একটা দোআ লিস্ট নিতে। দোআ কবুলের জায়গায় যাচ্ছি, নিজের যত যা কিছু চাওয়ার আছে, হজে যাচ্ছি জেনে মানুষ যত যা কিছুর জন্য দোআ করতে বলে, সব যেন এক সাথে লিখে নিয়ে যাই। অনেকে মুখে বলে দোআ করবে আমার জন্য, কিন্তু ঠিক কি দোআ করব, সেটা ঠিক করে বলে না, কিন্তু পরে আবার ধরে, 'দোআ করেছো তো আমার জন্য?' সত্যি বলতে কি, এভাবে বললে মনে থাকে না। মনে থাকে যখন লরেনের* মত নতুন মুসলিম হওয়া মেয়েটা ফোন তুলে নিজের একান্ত চাওয়াটার কথা ফিসফিসিয়ে বলে, 'শুনেছি কাবার কাছে দোআ করলে দোআ কবুল হয়, আমার শুধু এটাই চাওয়ার ছিল।' সব লিখে নিয়েছিলাম, এবং এই লিস্টটা খুব কাজে এসেছিল!
আর অবশ্যই, দোআ করছিলাম যখনই সুযোগ পেতাম--আমি কাবার সান্নিধ্যের উপকারটুকু যেন পুরাপুরি পেতে পারি, হজের প্রতিটা মুহূর্ত যেন উপভোগ করতে পারি। হজযাত্রায় আমার যেন এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না হয়। কারণ ওই যে, হজে যাওয়ার তৌফিক আল্লাহ দিচ্ছেন, তিনি চাইলে সবটুকু গিয়েও হজ না করতে পারি, হজ কবুল নাও হতে পারে। ইসমাইল ডেভিডসই বলেছিলেন, ১৯৭৫ সালে মিনায় আগুনের জন্য অর্ধেকের বেশি মানুষ হজ না করেই বাড়ি ফিরেছিল। আবার ওই যে, রিমা হজে গিয়েও সেই মুহূর্তগুলোতে থাকতে চাচ্ছিল না। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, সব টাকা জমা দেয়ার পর হজের প্রস্তুতিতে একসাইটমেন্ট প্রচুর, কিন্তু ভয় তার চেয়ে অনেক বেশি!
দুই তিন মাস ধরে এরকম টুকটাক প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম ভালোই, কিন্তু বিপত্তি বাঁধলো রওনা দেয়ার ঠিক দুই সপ্তাহ আগে। এথিকস অ্যাপ্লিকেশন করেছিলাম আগেই, কিন্তু কে বলবে, হজে যাওয়ার ঠিক দুই সপ্তাহ আগে সবগুলো ডাটা চলে আসল এক সাথে! নভেম্বরের মাঝামাঝি একটা অ্যাবস্ট্রাক্ট জমা দেয়ার শেষ তারিখ। এত লম্বা ছুটি দিয়েছেন সুপারভাইজার, সেই কৃতজ্ঞতাবোধ থেকেই ঠিক করলাম, যে করেই হোক, অ্যাবস্ট্রাক্টটা লিখে তারপরে যাব। ব্যাস, হজে যাওয়ার আগের দশ দিন প্রতিদিন (এমনকি রবিবারেও!) বাসা থেকে রওনা দিতাম ভোর সোওয়া ছয়টায়, সূর্যি মামার ঘুম ভাঙার আগে, আর বাসায় ফিরতাম রাত দশটায়, কিংবা আরও পরে! আমাদের ফ্লাইট ছিল মঙ্গলবার, সোমবারেও বাসায় ফিরলাম রাত দশটায়। রিমা বলে দিয়েছিল যাওয়ার আগের দুই সপ্তাহ বেশি করে ইবাদত করতে, কিন্তু কপালে থাকলে যা হয়! নিজের ব্যাগ গুছানোরও সময় পেলাম না, সব নও করলো। যাওয়ার দিন কোন মতে মাথা থেকে স্ট্যাটস আর প্রিম্যাচুয়ার বাচ্চাগুলোকে কম্পিউটার বন্দী করে রওনা দিলাম হজের উদ্দেশ্যে!
----------
*নাম বদলে দিলাম
2 মন্তব্য:
onek onek doa ei series tar jonno.. vishon rokom inspired. nou shaheb ke selam :)
-anon.
থ্যাংক য়ু অ্যানন, সালাম পৌঁছে দিব...
Post a Comment