Friday, February 11, 2011

হৃদয়ের পথে ৫: প্রথম তাওয়াফ


প্রথম তাওয়াফটা আসলেই খুব ওভারওয়েলমিং। অনেক খুঁজেও এখানে ওভারওয়েলমিং শব্দটার বদলে একটা বাংলা শব্দ বসাতে পারলাম না। ওভারওয়েলমিং মানে, এত সব ইমোশন এক সাথে চলে এসেছিল, কোন থই পাচ্ছিলাম না। কোন চিন্তাটাকে যে সামনে আসতে দিব--আমি সৃষ্টিজগতের প্রথম উপাসনালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, পৃথিবীতে আর কোন উপাসনালয়ে এত মানুষ এত দিন ধরে প্রার্থনা করে নি, ইসলামে না, ইসলামের বাইরেও না--দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই ধারণাটা আত্মস্থ করব, নাকি তাওয়াফ করব! আমার মাথা পুরা পুরি ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল সত্যি।



ছবিতে দেখতে পারছেন, তাওয়াফ শুরু করতে হয় কাবার একটা নির্দিষ্ট দিক থেকে। কত বই পড়েছি তাওয়াফের নিয়ম নিয়ে। ছবি দেখেছি। কিন্তু কাবার সামনে দাঁড়িয়ে আমি পুরাপুরি কনফিউজড হয়ে গেলাম, ভীষণ বোকা শোনালেও, কোথা থেকে তাওয়াফ শুরু করতে হবে বুঝতেই পারছিলাম না।

তার উপর তো আছে মানুষ, এত মানুষ! সব সময় টিভিতে উপর থেকে এরিয়াল
ভিউয়ে হাজীদের দেখে আমার সেখানকার বাস্তবতা সম্পর্কে কোন ধারণাই ছিল না।



বাস্তবতাটা সত্যি খুব অন্যরকম!

এবং প্রথম তাওয়াফ শেষে আমি অনেকগুলো মানুষের প্রতি বিরক্ত হয়ে গেলাম। কয়েকটা ক্যাটাগরি বর্ণনা করি।

আমার ধারণা ছিল তাওয়াফে পুরাপুরি মন দিয়ে, বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে পুরাপুরি ভুলে গিয়ে শুধু ঘুরব কাবার চারদিকে আর আল্লাহর সাথে কথা বলব। কিন্তু কিসের কি, হঠাৎই কোন রকম নোটিস ছাড়া কানের পাশে অশুদ্ধ উচ্চারণে গলা ফাঁটিয়ে কেউ একজন দোআ পড়া শুরু করে। তাকিয়ে দেখি সে নিজ ভাষায়, হয় বাংলা, না হয় তুর্কী, না হয় ইন্দোনেশিয়ান ভাষায় লেখা আরবি দোআ জোরে জোরে পড়ছে, পিছনে একদল মানুষ সাথে সাথে পড়
ছে। এরপর কি আর মনযোগ থাকে?

আস্তে করে সেখান থেকে সরে যেতে না যেতেই হঠাৎ ধাক্কা! কেউ একজন তাড়াহুড়া করে সবাইকে সরিয়ে দিয়ে সামনে আগানোর চেষ্টা করছে! মানুষটাকে জায়গা করে দিতে না দিতেই সামনে আবার দেয়াল! তাওয়াফ করতে হয় অ্যান্টি ক্লক ওয়াইজ, সবাই হাতের বাঁ দিকে ঘুরে। কিন্তু হঠাৎই দেখা যায় তাওয়াফ শেষ হওয়ার পর তিন চার জনের একটা গ্রুপ স্রোতের একেবারে উল্টা হেঁটে যে দিক দিয়ে বের হলে তাদের সবচেয়ে সুবিধা হয়, সেদিক দিয়েই বের হতে চাচ্ছে! অথচ আর একটু হেঁটে সামনে গিয়ে আস্তে আস্তে স্রোতের সাথে বের হতে পারত। তাতে নিজের অসুবিধা হতো, কিন্তু অন্যদের হতো না।

অথবা ঠিক তাওয়াফের জায়গায় দুনিয়াদারি সব উপেক্ষা করতে নামাজ পড়তে দাঁড়িয়ে গিয়েছে! কাবার যত কাছাকাছি নামাজ পড়া যায়!
তাওয়াফ করতে করতে একেবারে মাকামে ইবরাহীমের কাছাকাছি চলে গিয়েছিলাম। এত মানুষের মধ্যে তাওয়াফ করতে করতেও হঠাৎ কোন একটা জায়গা একদম ফাঁকা হয়ে যায়। তখন মাকামে ইবরাহীমের পাশে ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে দেখে নিলাম সেই মাকামে ইবরাহীম, যার কথা আল্লাহ কুরআনে বলেছেন 'নিদর্শন' হিসেবে... ওভাবেই দেখে চলে আসলাম। ইসমাইল ডেভিডস বলেছেন মাকামে ইবরাহীমের কাঁচটা হয়তো মেইড ইন বেলজিয়াম। বেলজিয়ান কাঁচ ধরে কোন লাভ নেই, অতএব, নো টাচিং, নো কিসিং, নো রাবিং। আমি না ধরলেই কি, কিছুক্ষনের মধ্যেই এক দঙ্গল মানুষ এসে এমন ভাবে নিজেদের কাপড় আর গা ঘষা শুরু করলেন মাকামে ইবরাহীমের সাথে, যে মনে হলো এটা ওদের জীবন মরণের ব্যাপার। মন খারাপ হলো।

প্রথম তাওয়াফে আসলে সারাক্ষনই ছটফট করলাম। তাওয়াফ শেষে একটু হতাশই হলাম, কেমন অপূর্ণ মনে হলো তা্ওয়াফটাকে। শুনেছি হজে ধৈর্য্য ধরতে হয়। কিন্তু আমি কেবল রাস্তা ঘাটে দেরি হবে, সেখানে ধৈর্য্য ধরতে হবে, সেসব বেশি শুনেছি। কিন্তু তাওয়াফ করতে গিয়ে যে মন এত খারাপ হবে, একদম তৈরি ছিলাম না সে জন্য। খুব মনে হলো, ইশ ইসমাইল ডেভিস যদি আরেকটু জোর দিয়ে বলতেন মানুষের ব্যবহার নিয়ে!

ইসমাইল ডেভিসের না বলাটা পূরণ হয়ে গিয়েছিল অপ্রত্যাশিতভাবে। নও হারামে* থেকে গিয়েছিল ফজরের পরে। আমি হোটেলে ফিরে এসেছিলাম। হোটেল থেকে দুপুর বেলা হারামে যেতে হোটেলের শাটল বাসে যখন একা একা বসে আছি, তখন ষাট/পয়ষট্টি বছরের একটা দম্পত্তি আমার পাশে এসে বসলেন। এত বয়স, কিন্তু চেহারায় অদ্ভূত একটা ইনোসেন্স আছে, দেখলেই বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করছে। আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কার সাথে হজ করতে এসেছি, মা বাবার সাথে?
'উহু, হাজবেন্ডের সাথে'।
দু'জনই আশ্চর্য হয়ে তাকালেন একে অপরের দিকে। 'তোমার বয়স কত?'
'চব্বিশ'।
দু'জনের সে কি হাসি। ওনারা নাকি ভেবেছিলেন একটা হাই স্কুলের মেয়ে একা একা হারামে যাচ্ছে, সে জন্য সঙ্গ দিতে বসেছিলেন আমার পাশে। মুহুর্তেই ভাব জমে গেল। অ্যাডাম যোগী আর ওনার স্ত্রী সাউথ আফ্রিকা থেকে। দু'জনের দাদারাই ভারত থেকে অল্প বয়সে গিয়েছিলেন সাউথ আফ্রিকায়। সুতরাং সাউথ আফ্রিকাই ওঁদের দেশ, ইংরেজিই ভাষা। জানলাম ওনারা দু'জনেই আর্টিস্ট! বিভিন্ন রকমের পেইন্টিং করেন, ক্যালিওগ্রাফী করেন। বিশেষ আগ্রহ আছে আর্কিটেকচার নিয়ে। আমি অল্প বয়সী আর্টিস্ট দম্পত্তি দেখেছি, কিন্তু ষাট বছর বয়সী কোন আর্টিস্ট দম্পত্তিকে আগে দেখিনি। সব কিছুতেই কি ভীষণ আগ্রহ! একজন কথা শেষ করছেন যেখানে, অন্যজন ঠিক সেখান থেকে কথা শুরু করছেন। আমার দেখা অনেক ষাট বছর বয়সীরা জীবনের শেষ প্রান্তে এসে জীবনসঙ্গী/সঙ্গিনী সম্পর্কে সীমাহীন অভিযোগ ছাড়া কথাই বলতে পারেন না। কিন্তু যোগী-দম্পত্তির কথা শুনেই বুঝতে পারছিলাম, ওনারা হিসাবের বাইরে!

আমি অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছি শুনে চমৎকৃত হলেন। বাংলাদেশী ব্যাকগ্রাউন্ড শুনে আরও চমৎকৃত হলেন। আরও বেশি আশ্চর্য হলেন যখন শুনলেন আমি পিএইচডি করছি আর আমার স্বামী ডাক্তার। কেইপ টাউনে নাকি পঞ্চাশ হাজার বাঙালী আছে, কিন্তু তিনি আজ পর্যন্ত কোন বাঙালী ডাক্তার দেখেন নি, বাঙালীরা যে পিএইচডি করতে পারে, তা-ই জানতেন না! হেসে ফেললাম আমি। সিডনীতে আবার উল্টা ঘটনা। নিদেনপক্ষে মাস্টার্স ছাড়া বাঙালী পা্ওয়া কঠিন। যোগী দম্পত্তি ভীষণ ভাবে দেখতে চাইলেন নও-কে। হোটেলের রুম নাম্বার দিয়ে দিলেন আর পই পই করে বলে দিলেন যেন দেখা করি।

যোগী দম্পত্তির সাথে দ্বিতীয়বার এবং হয়তো শেষ বার দেখা হলো এর দুই দিন পরে। আমাদের হোটেলটা দামী বলে সাউথ আফ্রিকান হজ গ্রুপটা হারাম থেকে একটু দূরে, 'আজিজিয়া' নামের একটা জায়গায় হোটেল নিয়ে চলে যাচ্ছিল যেদিন, সেদিন। প্রায় দু'ঘন্টা গল্প হলো যোগী দম্পত্তির সাথে। আমি মুগ্ধ হয়ে দেখলাম ষাট বছর বয়সী এই দম্পত্তিকে। জীবন নিয়ে এত সুখী ষাট বছর বয়সী কয়টা দম্পত্তি দেখেছি ভাবতে গিয়ে দেখলাম এক আঙ্গুলে গুণতে পারছি। হজ নিয়ে তো গল্প হলোই, অ্যাডাম যোগী আমাকে কেইপ টাউনে দা্ওয়াত দিলেন দু'টো কারণে। প্রথম কারণ হচ্ছে, ওনার টেলিস্কোপ দিয়ে আকাশরে তারা চিনাবেন। সাউথ আফ্রিকার আকাশ অস্ট্রেলিয়ার মত দক্ষিণ গোলার্ধে। আর দ্বিতীয় কারণটা হলো, ওনার দৃঢ় বিশ্বাস সাউথ আফ্রিকায় আমাদের ভবিষ্যত উজ্জ্বল! কথা দিলাম, ঘুরার টপ প্রায়োরিটিতে সাউথ আফ্রিকা থাকবে ইনশাআল্লাহ। গল্পের মাঝে মাঝেই অ্যাডাম যোগী অদ্ভূত সুন্দর কিছু কিছু কথা বলছিলেন, যার একটা মাথায় আটকে গিয়েছিল।

"Do not expect perfection from anyone but Allah. Only Allah is perfect, and no one else. Live your life according to this philosophy, you will never be disappointed with life."

ঠিক ওই মুহূর্তে বুঝেছিলাম আমার সমস্যা এখানেই। আমি শকড হচ্ছিলাম তাওয়াফে মানুষের ব্যবহার নিয়ে। সমস্যাটা মানুষের ব্যবহারে ছিল না। ছিল আমার এক্সপেকটেশনে। আমি অন্যদের কাছে (এমনকি নিজের কাছেও!) পারফেকশন আশা করছিলাম, যেটা ভীষণ অনুচিত। কারণ, অনলি আল্লাহ ইজ পারফেক্ট।

অ্যাডাম যোগীর এই কথাটার সিগনিফিকেন্স কি হবে তখন বুঝি নি, কিন্তু পুরা হজে, এমনকি এখনও এই কথাটা, ঠিক ওই টোনটা আমার কানে ভেসে উঠে যখন কথাটা মনে হওয়া খুব দরকার, তখন।

----------

*হারাম = কাবাকে ঘিরে যেই মসজিদ, সেটাকে মসজিদুল হারাম বলা হয়, আর পুরা মক্কাকেই 'হারাম' এলাকা বলা হয়। কারণ হারাম এলাকায় কোন ধরণের রক্তপাত বা জীবহত্যা নিষিদ্ধ।

ছবি সূত্র

2 মন্তব্য:

MIReja said...

apu ami ekjon bangali, apnar lekha amar khub bhalo lage, apu apni phd korchen kisher upor, porashonar majhe islam niye porar shomoy pan kibhabe? ami B.Sc korchi EEE er upor, amar ialam niye porashonar khub interest ache, but jokhon B.Sc er porasona niye busy hoye jai, tokhon thik moto namjeo concentrate korte pari na, shob shomoy mathai B.Sc er porashona ghurpak khethe thake, abar jokhon porashona thekhe chuti pai thokon shundor kore concentrate korte pari.......... tai majhe majhe ecche hoi porashona chere diye shudu islam niye porashona korbo.... can u please give me some suggestion. May ALLAH bless u for ur good work,Ameen.

Muhammad said...

apu ami ekjon bangali, apnar lekha amar khub bhalo lage, apu apni phd korchen kisher upor, porashonar majhe islam niye porar shomoy pan kibhabe? ami B.Sc korchi EEE er upor, amar ialam niye porashonar khub interest ache, but jokhon B.Sc er porasona niye busy hoye jai, tokhon thik moto namjeo concentrate korte pari na, shob shomoy mathai B.Sc er porashona ghurpak khethe thake, abar jokhon porashona thekhe chuti pai thokon shundor kore concentrate korte pari.......... tai majhe majhe ecche hoi porashona chere diye shudu islam niye porashona korbo.... can u please give me some suggestion. May ALLAH bless u for ur good work,Ameen.