গত পোস্টে পড়ে বুঝতে পারার কথা যে হঠাৎই অনেক রকম মানুষ এবং তাদের নানা রকম ব্যবহারে প্রথম দিনগুলোতে একটু বিরক্ত ছিলাম। পশ্চিমে বড় হওয়ার একটা কুফল হচ্ছে, আমাদের 'পারসোনাল স্পেইস' অনেক বড়। পশ্চিমে যারা থেকেছেন, তারা বুঝবেন এটা। এখানে মানুষ কারো পাশে দাঁড়ানোর সময় অন্তত: আধা হাত দুরত্ব নিয়ে দাঁড়ায়, সহজে কেউ কারো গায়ে হাত দেয় না, হাত ধরে না। এই করতে করতে, তাওয়াফের সময় ভিড়ের মধ্যেও যখন কেউ খুব কাছ ঘেষে দাঁড়াতো, বা কাঁধে হাত রাখতো, আমি সেটা সহ্য করতে পারতাম না। হঠাৎই মেজাজ গরম হয়ে যেত! অথচ এটা কিন্তু বাংলাদেশে খুবই কমন একটা ব্যাপার। কি ধরণের স্পর্শের কথা বলছি, সেটা নিচের ছবিতে দেখুন। ছবিটা আমার ভাইয়া তুলেছিল, কারণ এই একটা ব্যাপার ওকেও খুবই বিরক্ত করতো!

একদিন তাওয়াফের সময়, আমার ঠিক পিছনে ছিলেন হিন্দী/উর্দুতে দোআ পড়তে থাকা একজন তিরিশ/পয়ত্রিশ বছরের হুজুর টাইপের লোক এবং তাঁর স্ত্রী। উনি দোআ পড়তে পড়তে, হঠাৎ ভিড় বেড়ে যাওয়ায়, তাওয়াফের চরম মগ্নতায় আমার পিছনে হাত দিলেন, ঠিক ছবির মতই। খুবই নির্দোষ স্পর্শ কিন্তু মেজাজ গরম হলে কি করব! ঘাড় ঘুরিয়ে ঠান্ডা চোখে হাতের দিকে তাকালাম। উনি থতমত খেয়ে হাত সরিয়ে নিলেন। কিছু দুর গিয়ে আবারও একই কান্ড। আমি আবারও তাকালাম। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে দুই বারই ওনার স্ত্রীও ব্যাপারটা খেয়াল করেছিলেন! এরপর কিসের তাওয়াফ, কাবার চারপাশে ঘুরতে ঘুরতেই তারস্বরে জামাইকে প্রচন্ড বকা! হালকা পাতলা খারাপ লাগলেও ভাবলাম, থাক, শিখার দরকার আছে!
এই কথাটা উল্লেখ করলাম খুব সাধারণ একটা ব্যাপার বুঝানোর জন্য। আউটলুকে পুরাপুরি হুজুর মনে হলেও তিনি এই সাধারণ ব্যাপারটা নিয়ে সচেতন ছিলেন না যে গায়ের মাহরাম বলে সামনের মেয়েটাকে স্পর্শ করার কোন অধিকার ওনার নেই, যত ভিড়ই হোক, দুরত্বটা নিজেরই বজায় রাখতে হবে।
হজে এত ধরণের মানুষ যায়, যে অনেকেই এরকম বেইসিক অনেক কিছুই
খেয়াল করেন না। যদিও মসজিদুল হারামে ছেলেমেয়েদের এক সাথেই সব করতে হয়, কিন্তু নামাজের সময় যেখানে পাশাপাশি বসা ছাড়াও উপায় থাকে, সেখানে অপরিচিতা, গায়ের মাহরাম একটা ছেলে/মেয়ের পাশে বসা বলা আমার অনুচিত মনে হয়। কিন্তু এটা অনেকেই খেয়াল করেন না। সামনে দিব্যি ফাঁকা রেখে বিপরীত লিঙ্গে কারও পাশে বসে যান সঙ্গ বিচার না করে। অথচ নওয়ের সাথে কখনও বসতে হলে, আমি সব সময় খেয়াল করে বসতাম যেন আমার এক পাশে একটা মেয়ে থাকে, আর অন্য পাশে নও হয়।
এসব দিক খেয়াল রেখেই, মসজিদুল হারামে ছেলে আর মেয়েদের নামাজের কিছু বেইসিক আলাদা জায়গা আছে। বিশাল একটা জায়গা জুড়ে শুধু মেয়েরা, কিংবা ছেলেরা। কাবার চারপাশের সাদা জায়গাটাতেও মেয়েদের নামাজ পড়ার জন্য একটা ঘেরাও করা জায়গা আছে। ছবিতে দিলাম, ওই যে ঘেরাও করা জায়গাটুকু।

মেয়েদের জায়গাগুলো আলাদা হওয়া ভালো দিক হচ্ছে, কোন মেয়ে একা আসলে তারা এই জায়গাগুলোতে অন্তত: স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারে। কিন্তু খারাপ দিক হচ্ছে, মেয়েদের জন্য আলাদা করা অনেক জায়গাই একটু পিছনের দিকে। তাওয়াফের সাদা জায়গাটায় তো দেখতেই পাচ্ছেন, নিতান্তই অপ্রতুল। অথচ সেখান থেকেই কাবা দেখা যায় খুব ভালো করে! মসজিদের ভিতরেও, সামনে ছেলেরা, পিছনে মেয়েরা। অথচ, অথচ হাদীসে প্রমানিত, কাবার দিকে তাকিয়ে থাকলেও সওয়াব হয়! এত দূর এসে, এত টাকা দিয়ে হজ করতে এসে যদি কাবা দেখাই না যায়, তাহলে তো খুব বড় লস হয়ে যায়! মেয়েদের বুঝি সওয়াব দরকার নেই? কাবা দেখে খুব আবেগে চোখের পানি ফেলার ইচ্ছা নেই?
সারা বছর, যখন মানুষ কম থাকে, তখন কিন্তু এই জায়গা ভাগটা খুব ভালো কাজ করে। মেয়েরা খুব শান্তিতে তাওয়াফ করতে পারে, কাবা ছুঁয়ে কাঁদতে পারে, কাবাকে সামনে রেখে নামাজ পড়তে পারে। কিন্তু হজের সময়ে যখন মানুষ বেশি থাকে, তখন এই জায়গা ভাগের জন্য মেয়েরা তাওয়াফের সময় ছাড়া কাবা ভালো করে উপভোগ করতে পারে না।
ওখানে 'ক্রাউড কন্ট্রলের' জন্য প্রচুর পুলিশ ছিল। বেশির ভাগ পুলিশই ছিলেন ভীষণ ভালো, কিন্তু কিছু কিছু পুলিশ এই মেয়েদের আলাদা জায়গাটাকে খুব সিরিয়াসলি নিতেন। তাওয়াফ তো এক সাথেই করতে হবে, কিন্তু নামাজ পড়ার সময়, মেয়েরা কিছুইতেই মেয়েদের জায়গা ছাড়া আলাদা বসতে পারবে না! বসলেই তাকে উঠিয়ে দেয়।
প্রথম প্রথম কাবার সামনে নামাজ পড়ার জন্য খুব আবেগ নিয়ে দুই ঘন্টা আগে গিয়ে মেয়েদের জায়গায় বসে থাকতাম। কিন্তু নামাজের সময় যত আগাতো, তত পুলিশগুলো তাওয়াফের অন্যান্য জায়গাগুলো থেকে মেয়েদের উঠিয়ে উঠিয়ে মেয়েদের জায়গায় ঢুকিয়ে দিত। শেষের দিকে একেবারেই বসার জায়গা থাকত না! যেখানে এক রো মানুষ বসার কথা, সেখানে তিন রো মেয়েরা বসতো। কান্না পেত রীতিমত, দুই ঘন্টা আগে এসেও, সিজদা দিতে হতো আরেকজনের উপর! কিন্তু তবু, মেয়েদের জায়গাতেই মেয়েদের নামাজ পড়তে হবে! হিসেব করে দেখেছিলাম পুরা কাবার চারপাশের সাদা জায়গাটার দশ ভাগের এক ভাগ হয়তো মেয়েদের জন্য আলাদা করা। হজ করতে মেয়েরা অবশ্যই ছেলেদের চেয়ে কম যায়, কিন্তু দশ ভাগের এক ভাগ থাকে না নিশ্চয়ই!
তখন খুব রাগ হতো। আমার মা যখন হজ করেছেন, তখন উনি এই নিয়ম মানতে রাজি ছিলেন না। মেয়েদের জায়গা যখন ভরে গিয়েছে, তখন ঠিক গিয়ে তাওয়াফের জায়গায় বসেছেন, পুলিশের হাজার বকা উপেক্ষা করে, গায়ে তো আর হাত দিতে পারবে না! অনেক মহিলাই দেখলাম তা-ই করছে। কিন্তু আমি হজে যাওয়ার আগেই ঠিক করে নিয়েছিলাম যে আমি পুলিশদের কথা অমান্য করব না। ওরা হারামের দেখা শোনা করছে, এত বড় কাজ করছে, যদি মুসল্লীরা সহযোগিতা না করে, তাহলে কিভাবে করবে? কিন্তু কখনও কখনও সত্যি সত্যি এত রাগ হতো! ওরা দেখতে পাচ্ছে মেয়েদের জায়গায় আর জায়গা নেই, নামাজের ইকামতও হয়ে গিয়েছে, কিন্তু তবু মেয়েদের বলে বলে ঢুকাচ্ছে সেই ঘেরাওয়ের ভিতরে!

উপরের ছবিতে দেখতে পারছেন, মেয়েদের জায়গা থেকে ঠিক বের হওয়ার রাস্তায় বেশ ভিড় থাকে। সেখানে ভিড়ের অন্যতম কারণ হচ্ছে, মেয়েদের জায়গার ঠিক পিছনে জমজম পানির কল আছে। যদিও সারা মসজিদুল হারামে জমজমের কল অনেক, কিন্তু তাওয়াফের বা নামাজের পরই দেখা যায় পুরুষরাও কাছে বলে ওখান থেকে পানি নিতে আসেন, বা ওই দিকটা ব্যবহার করে 'রাস্তা' হিসেবে, অন্য দিকে যাওয়ার জন্য। আমি যতবার মেয়েদের জায়গায় নামাজ পড়েছি, ততবার বের হওয়ার সময়ই দেখি বের হওয়ার পথটায় এত পুরুষ! কিছুতেই স্পর্শ বাঁচিয়ে বের হতে পারতাম না। তখন ওই পুলিশগুলোর উপর আরও রাগ হতো, এখানে এসে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না কেউ? মেয়েদের ঢুকাচ্ছে ঠিক, কিন্তু বের হওয়ার সুযোগটা তো দিচ্ছে না!
এই কথাগুলো বলব কি না ভাবছিলাম। শেষ মেষ ঠিক করলাম, বলব। কারণ, মেয়েদের হজের সময় কিছু 'অতিরিক্ত' এবং অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি আছে, তার একটা এটা। এই দিকটা জেনে থাকা দরকার। আমার সামান্যতম প্রস্তুতি থাকলেও হয়তো আমার এতটা কষ্ট লাগত না! আমি হজে যাওয়ার আগে আমাকে কেউ বলে নি এসব! কোন বইয়ে পড়ি নি, কোন ব্লগে পড়ি নি! অথচ হজে অনেকের সাথে কথা হয়েছে, দেখলাম অনেকেই আমার মত অনুভূতি, বিশেষ করে মালয়শিয়ান এবং ইন্দোনেশিয়ানদের, যারা নারী অধিকার সচেতন পরিবেশে বড় হয়েছে। অবাক হয়েছিলাম যে আমার মা-ও আমাকে এসব আগে বলে নি! সেজন্য দেখা যেত শুধু নও বেচারাই আমার কথা শুনে শুনে বাষ্পের চাপ কমাতো! আমার অভিজ্ঞতাগুলো সুন্দর করার জন্য ওর অবদান অনেক (হিন্ট: স্বামীদের অবদান অনেক থাকতে পারে!), সেগুলো পরে বলব।
আস্তে আস্তে যা বুঝলাম, সাধারণ নিয়ম হচ্ছে, ফরজ নামাজের জামাতে
১. 'একই রো' তে নারী এবং পুরুষেরা এক সাথে দাঁড়াতে পারবে না
২. নারীদের পিছনে পুরুষদের নামাজ হবে না
সাধারন নিয়ম এরকম হলেও, কিছু কিছু ফিকহে মসজিদুল হারামকে নিয়মের ব্যতিক্রম বলা হয়েছে, অর্থ্যাৎ সেখানে এর অন্যথায় হলে অসুবিধা নেই। কিন্তু অনেক ফিকহে আবার মসজিদুল হারামের ক্ষেত্রেও একই আইন।
আবার, কিছু কিছু ফিকহে আবু হুরাইরা (রা) এর একটা হাদীস অনুযায়ী, পুরুষদের নফল নামাজের সামনে দিয়ে নারীরা হেঁটে গেলে নামাজ ভেঙে যাবে। একই প্রসঙ্গে আয়েশা (রা) পুরাপুরি দ্বিমত পোষণ করেছেন। যেহেতু এখানে সমান ওজনের দু'টো প্রমান, তাই এই সামান্য ব্যাপারটা নিয়ে অনেক মতানৈক্য।
এরকম কিছু 'ভিন্নমত' এবং বিপরীতমুখী আইন থাকার কারণেই ওখানে অনেক ক্যাচাল হয়! এমনি ছোট ব্যাপার মনে হলেও, এগুলো ঠিক ছোট না। এখানে নামাজ ভ্যালিড বা ইনভ্যালিড হওয়ার ব্যাপার! কাবার সামনে এসে কষ্ট করে নামাজ পড়লেও যদি এরকম লজিস্টিক ভুলের জন্য নামাজ বাতিল হয়ে যায়, তাহলে মানুষ এগ্রেসিভ হবে না! যেহেতু পুলিশগুলো ভাবছেন এগুলো শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রন না করলে অনেকগুলো হাজীর নামাজই ইনভ্যালিড/বাতিল হয়ে যাবে, সে জন্য এগুলো ওরা খুব সিরিয়াসলি নিতেন! আমার সেটাতে সমস্যা নেই। আমি অনেক মতামত নিজে না মানলেও অন্য কেউ যখন ভাবছে কিছু করলে তার নামাজ নষ্ট হয়ে যাবে, তখন কেন তাকে শুধু শুধু কষ্ট দিব! আমার আপত্তি ছিল, আমার ধারণা, মেয়েদের জন্য বরাদ্দ রাখা জায়গাগুলো অপ্রতুল! মানে এমনিতে মেয়েদের জন্য নামাজের জায়গার অভাব নেই, বলছি সামনের দিকের, ভালো ভালো জায়গাগুলোর কথা, যেখানে বসে কাবার সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়!
এসব আমাকে আগে বলে নি কেন সে নিয়ে একটু মন খারাপ করে ভাইয়াকে এসএমএস করেছিলাম সেই সময়ে। ও খুব সুন্দর একটা রিপ্লাই দিয়েছিল। একে তো ও কখনও এই ব্যাপারগুলো বুঝতে পারে নি ও ছেলে বলে, তারপর বলেছিল, 'যেগুলো তুমি এখনই পরিবর্তন করতে পারবে না, সেগুলো নিয়ে এখন বেশি চিন্তা করো না, হজ থেকে ফিরে এসে করো। রিমেম্বার, ডু নট লেট আদার পিপল রুইন য়ুর এক্সপেরিয়েন্স!'
বেশ কয়েকবার পড়লাম এই লাইনটা, 'ডু নট লেট আদার পিপল রুইন য়ুর এক্সপেরিয়েন্স। বুঝলাম শয়তান আমার নারীবাদী মনটার সুযোগ নিয়ে আমাকে মেজাজ খারাপে সময় নষ্ট করাতে চাচ্ছে!
এর পর থেকে বিরক্তিগুলো পুরাপুরি উধাও হয়ে গেল!
0 মন্তব্য:
Post a Comment