Sunday, March 20, 2011

হৃদয়ের পথে ৭: নামাজ

আমার যে দিকগুলো খারাপ লেগেছিল, সেগুলো আগে ভাগে বলে নিলাম। খারাপ লাগাগুলো প্রথম দিকেই ছিল। আস্তে আস্তে মসজিদুল হারামের গভীর প্রেমে পড়ে গেলাম! তখন যেগুলো প্রথম দিকে খারাপ লাগত--মানুষের ধাক্কাধাক্কি, শুধু নিজেকে নিয়ে চিন্তা করা, সেগুলোকেও খারাপ লাগত না। যারা এমন করত, তাদের জন্য এক্সকিউজ দাঁড় করাতে শিখে গেলাম, জানে না, ভিন্ন সমাজে বড় হওয়া, ইত্যাদি।

মসজিদুল হারামের সম্মানে, পুরা মক্কার যে কোন জায়গায় নামাজ পড়লে সাধারন সওয়াবের এক লাখ গুণ বেশি সওয়াব হয়! তার উপর তো জামাতে নামাজের সওয়াব আছেই, বাসায় পড়া নামাজের চেয়ে সত্তর গুণ বেশি! সিডনীতে আমার যে কোন নামাজের যে লাখ লাখ গুণ বেশি মূল্যবান নামাজ জেনেই পড়তে যেতাম প্রতিটা নামাজ।

সিডনীতে আজান শোনার তো প্রশ্নই উঠে না, আমি বড় হয়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। যারা ঢাবি এলাকায় থেকেছেন, তারা জানেন, ঢাকা মসজিদের শহর হলেও, ঢাবিতে আজান শোনার উপায় নেই। ফলে আমার জীবনে আসলে দিনে পাঁচ বার আজান শোনার অভিজ্ঞতা খুব অল্প। সেই আমি সুযোগ পেয়ে গেলাম পুরা এক মাসের জন্য দিনে পাঁচবার আজান শোনার! তাও মসজিদুল হারামের আজান শোনার সৌভাগ্য, যেখানে প্রথম সিজদায় মাথা ঠেকিয়েছেন আদম (আ)। এই এক মাসেই আজানের দোআগুলো মুখস্ত হলো আমার, আগে কখনও প্রয়োজন পড়ে নি বলে মুখস্ত করা হয়ে উঠে নি!

মসজিদুল হারামের সাউন্ড সিস্টেম অসাধারন। মসজিদের যে জায়গাতেই থাকেন না কেন আপনি, মনে হবে একেবারে কাছ থেকে আজান হচ্ছে! ঢাকায় যেমন পাঁচ মসজিদের আজান এক সাথে হয়ে কোনটাই আর বুঝা যায় না, এক এক সময় আসলে 'সাউন্ড পলিউশন-ই' মনে হয়, এখানে সেরকম না। কোন রকম ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ নেই, শুধু আজান, নামাজের দিকে মানুষের আহবান। সেই ভিতরটা ছোঁয়া, উল্টে পাল্টে দেয়া আজান, কেউ যদি নিজে থেকে অনুভব করে না শুনে থাকেন, তাহলে সত্যিই বুঝতে পারবেন না... শুনতাম আর ভীষণ কৃতজ্ঞ বোধ করতাম আল্লাহর প্রতি... আর আজানের প্রতিটা শব্দ কি ভীষণ অর্থবহ হয়ে যেত...

মনে আছে, একদিন খুব টায়ার্ড ছিলাম, জোহরের পরে রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছি। আসরের নামাজ মসজিদে পড়তে পারি নি। যতদিন মক্কায় থেকেছি, খুব অল্প নামাজই মসজিদে পড়ি নি। কি যে আফসোস হচ্ছিল! তারপর যখন মাগরিবের জন্য মসজিদে আসলাম, তখন আজানের 'হাইয়া আলাস সালাহ' (এসো নামাজের দিকে) শুনতে শুনতে যখন 'লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ' (আল্লাহ ছাড়া অন্য সবাই ক্ষমতাহীন) বলছিলাম, তখন খুব ইমোশনাল হয়ে গিয়েছিলাম। আসলেই আল্লাহ করার তওফিক না দিলে কিচ্ছু করার উপায় নেই... কিচ্ছু না... কত কিছু মনে পড়ে গেল, কত প্ল্যান, সব কিভাবে ভেস্তে যায়, আর আল্লাহর ইচ্ছার কথা মনে করতে হয়। আবার কত কিছু অভাবনীয় ভাবে পেয়ে যাওয়া, তখনও আল্লাহকে মনে হয় খুব বেশি করে! আগে আমার আজান ক্লক ব্যাপারটা কেমন যেন মেকি মেকি লাগত, ভাল্লাগতো না। কিন্তু সিডনীতে ফিরে আসার পরে যখন একটা আজান ক্লক গিফট পেলাম, সেটা ঠিক যত্ন করে ঘরে রেখে দিলাম। মনযোগ দিয়ে আজান শুনি, আর এখনও খুব উল্টা পাল্টা দিন কাটলে 'হাইয়া আলাস সালাহ' অংশটা আসলে খুব ইমোশনাল হয়ে যাই।

আজান আর ইকামতের মাঝখানে সব দোআ কবুল হয় বলে তখন ভেজা মন নিয়ে কত কিছু চেয়ে নিতাম আল্লাহর কাছে...

মসজিদুল হারামে সকালে দুইটা আজান হয়, তাহাজ্জুদের আজান আর ফজরের আজান। প্রথম দিকে তাহাজ্জুদের জন্য মসজিদে থেকে একটু আত্মতৃপ্তি হচ্ছিল, হুহ, সারা জীবন কত কষ্ট করেও তো তাহাজ্জুদের জন্য উঠতে পারি না, এখন কি সহজেই মসজিদে চলে এসেছি, আত্মতৃপ্তি হবে না! অমা, কিছুক্ষণের মধ্যে দেখি মসজিদে তিল ধারণের আর জায়গা নেই! সত্তর, আশি, নব্বই বছরের থুড়থুড়ে বুড়া বুড়িরা, এমনকি তিন বছরের বাচ্চা কাচ্চা সহ মাবাবারাও চলে এসেছে মসজিদে! তখন প্রথম টের পেয়েছিলাম, আল্লাহকে খুশি করার জন্য যে প্রতিযোগিতা, এই প্রতিযোগিতাটা আসলে বেশ ভালোই প্রতিদ্বন্দিতাময়, এখানে আমার জেতার কোন চান্স নেই!

প্রিয় আজান মুহূর্ত:

১. ঠিক কাবার সামনে মেয়েদের জায়গায় নিজের অবস্থানটা অনেক যুদ্ধ করে টিকিয়ে রেখেছিলাম সেদিন! যখন ফজরের আজান শুরু হলো, অদ্ভূত সুন্দর কণ্ঠে, সুরে, কথায়... আমার ঠিক সামনে কাবা, পৃথিবীর প্রাচীনতম প্রার্থনাঘর... তখন নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবতী মানুষ মনে হচ্ছিল...

২. তখনও মসজিদুল হারামে তেমন ভিড় শুরু হয় নি। ছাদে উঠেছিলাম মাগরিবের নামাজ পড়তে। হঠাৎই পেয়ে গেলাম এক দঙ্গল মালয়শিয়ান বোন! সবাই এক সাথে, নামাজের সুশৃংখল লাইন করে বসে আছে। কিন্তু ছাদের রেলিঙের পরেই, সবচেয়ে সামনের লাইনে একজন লোক বসে আছে বলে তার পাশে বেশ বড় একটা ফাঁকা রেখে তারপরে বসেছে অন্য মেয়েরা। তাড়াতাড়ি আমি আর নও চলে গেলাম ওখানে। নও বসলো লোকটার পাশে, তার ডান পাশে আমি, আমার ডান পাশে মালয়শিয়ান একজন বোন। সেখানে বসে রেলিঙের ফাঁকা দিয়ে দেখতে থাকলাম পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যগুলোর একটা। কাবা, আর কাবাকে ঘিরে আল্লাহকে স্মরণ করতে থাকা হাজার হাজার মানুষ... সে কি নিরন্তন ভাবে ঘুরছে আর ঘুরছে, ক্ষমা আর সন্তুষ্টি পাওয়ার আশায়... ঠিক সেই মুহূর্তেই আজান হলো... চারিদিক ছাপিয়ে... আর মুহূর্তেই হাজার হাজার মানুষগুলো কিভাবে যেন সুশৃংখল লাইনে লাইনে দাঁড়িয়ে গেল!

এই ছবিটা কবে তুলেছি মনে নেই, কিন্তু মোটামোটি এই অবস্থান থেকে এরকম দৃশ্যই দেখছিলাম মনে আছে...



৩. হজের পরে একদিন তাহাজ্জুদের সময় মসজিদে যাচ্ছিলাম। ঠিক যখন ছাদের পথে উঠছি, তখনই আজান শুরু হলো। আর তখনই নও দেখালো বাঁ দিকের আকাশে এত্ত বড় চাঁদ! সেদিন আমি ছবি তুলি নি, নওয়ের মোবাইলে তোলা ছবিগুলো দিচ্ছি। ছবিগুলোর মান তেমন ভালো না হলেও আমার কাছে ছবিগুলো অসম্ভব রকমের স্মৃতি জাগানিয়া আর অসাধারন!




৪. ছাদে বসে বসে ফজরের আজান শুনছিলাম... উপরে তাকিয়ে দেখি আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ, হুড়মুড়িয়ে ভেসে যাচ্ছে পূর্নিমার চাঁদের উপর দিয়ে, আস্তে আস্তে চাঁদটাকে উম্মোচন করে... সেই মুহূর্তে ওই দৃশ্যটা দেখে হঠাৎ কেন যেন মনে হলো আল্লাহর ক্ষমা আর সন্তুষ্টির দ্বার এভাবেই হুড়মুড়িয়ে খুলে যাচ্ছে আজানের সাথে সাথে... ভিতরটা কি ভীষণ ভাবে দুলে উঠেছিল আমার!
এক একবার ঘড়ি ধরে দেখতাম, নামাজের আজান থেকে শুরু করে নামাজ শেষ করে বের হতে হতে কম পক্ষে এক ঘন্টা পার হয়ে যায়। অথচ, সময়টাকে মোটেও এক ঘন্টা মনে হতো না... নামাজের মধ্যে প্রতিটা মুহূর্তকে উপভোগ করতাম। তখন খুব অপরাধবোধ হতো... সিডনীতে নামাজের জন্য পাঁচ মিনিট বের করতে গেলেও মনে হয় কত সময়! কত কাজে দেরি হয়ে যাবে! নামাজ পিছাতে পিছাতে একেবারে শেষ মুহূর্তে পড়ি কত সময়! অথচ, ওখানে এক ঘন্টা কি সহজেই কেটে যেত... আজানের কথা বললাম, তেলওয়াতের কথা বলি নি। হুদাইফিয়া যে সময়টায় নামাজ পড়াতেন, তখন কি অদ্ভুত লাগত! এতদিন সিডিতে শুনে কেমন যেন ক্লীশেইড লাগত, অথচ যখন হুদাইফিয়া নামাজ পড়াচ্ছিলেন, কেবল একটা কণ্ঠ ছিলেন না, একজন জলজ্যান্ত, আবেগপূর্ণ মানুষ, আল্লাহর সামনে আর সবার মতই ভালনারেবল, তখন নামাজকে পুরাপুরি উপভোগ না করে উপায় আছে!

মক্কার দিনগুলোর যে দিকটা সবচেয়ে বেশি মিস করছি তা হচ্ছে-- নামাজ পড়াকে ঘিরেই দিনের আর সব কিছু ঠিক করা হতো... কখন খাব, কখন ঘুমাব, কখন ঘুম থেকে উঠব, কখন গোসল করব, কখন তাওয়াফ করব, কখন শপিঙে যাব... সব। সারা জীবন শুনে এসেছি একজন মুসলিমের জীবনের সব কিছু নামাজকে ঘিরে হয়... কিন্তু সত্যিকার ভাবে কখনও ওটা আমার জীবনে পাই নি এর আগে। এখন যখনই মনে হয়, তখনই খুব মিস করি অল্প কয়েকদিনের সেই জীবনটাকে...

0 মন্তব্য: