Sunday, March 20, 2011

হৃদয়ের পথে ৮: "ভালো সময়"

যেহেতু মসজিদুল হারামে তাওয়াফের সওয়াব নফল নামাজের চেয়ে দেড় গুণ বেশি, সে জন্য শুধু ফরজ নামাজের সময় স-অ-ব কিছু স্থির থাকে... ফরজ নামাজের ইকামত দাঁড়ানোর ঠিক আগ পর্যন্ত চলতে থাকে তাওয়াফ, তারপরে সালাম ফেরানোর সাথে সাথে শুরু হয় সেই অ্যান্টি ক্লক ওয়াইজ, ক্লান্তিহীন, বিরতিহীন ইবাদত। আমাদের একটা তাওয়াফ করতে গড়ে এক ঘন্টার কিছু বেশি লাগত। কাবার যত কাছাকাছি তাওয়াফ করা যায়, কম দুরত্বের জন্য সময় কম লাগার কথা। কিন্তু হজের সময়ে কাবার চত্ত্বরে (মাতাফ, সাদা জায়গাটায়) প্রচন্ড ভিড় থাকে, বিশেষত যে সময়টাতে মানুষের তাওয়াফ করা সুবিধা, সে সময়টায় খুব ভিড় থাকতো।

আমি খুব ভিজুয়াল লার্নার, কেউ মুখে মুখে ডিরেকশন দিলে কিচ্ছু বুঝতে পারি না, ম্যাপ দেখে সেটা এক মিনিটে বুঝে ফেলি! বরাবর পড়া মুখস্ত করতাম এঁকে এঁকে। সে জন্য তাওয়াফে কখন ভিড় থাকে সেটা বুঝাতে একটা চার্ট এঁকে ফেললাম! নিচে ছবিতে দেখুন “মিডনাইট”, অর্থ্যাৎ মধ্য রাত থেকে শুরু করে পুরা এক দিনের সময় দিয়েছি নিচে, আর উপরে আঁকা নীল দাগটা যত উপরে থাকবে, ভিড় তত বেশি থাকে! লাল হার্টটার অর্থ হচ্ছে, সেই সময়ে তাওয়াফ করা আমি পছন্দ করতাম! আর হলুদ মন খারাপ করা মুখটার অর্থ হচ্ছে, সেই সময়ে তাওয়াফ করা রীতিমত ভয় পেতাম!

বিস্তারিত বলছি... তাহাজ্জুদের আজান হওয়ার সাথে সাথে (আমাদের সময়ে চারটার দিকে) খুব ভিড় শুরু হয়ে যেত। তাই ঠিক আজানের মোটামোটি এক ঘন্টা আগে যাওয়া গেলে খুব শান্তিতে তাওয়াফ করা যেত কাবার চত্ত্বরে। আবার ফজরের নামাজের পরেও খুব ভিড় থাকত। সেই ভিড়টা ঘন্টা খানেক পর্যন্ত থাকত। তার মানে কিছু মানুষ ফজরের নামাজের জন্য একটু আগে এসে তাওয়াফ সারতো আর কিছু মানুষ নামাজের পরে তাওয়াফ করতো। তারপরে আবার মোটামোটি সূর্যোদয়ের সময় থেকেই সকাল আটটা পর্যন্ত বেশ ফাঁকা একটা সময় যেত। বুঝলাম তখন হয়তো রাত জেগে ইবাদতকারী মানুষগুলো ঘরে ফিরে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন! তাই সেই সময়টায় আমরা চামে চামে তাওয়াফ সেরে নিতাম (প্রথম লাল হার্ট!)! আটটার সময়ই আবার ভিড় শুরু! তার মানে অনেকে ফজরের নামাজ শেষে ঘরে ফিরে যেত, তারা হয়তো নাস্তা টাস্তা করে ফিরে আসতো তাওয়াফ করতে! একটু পরে ভিড় একটু কমলেও মোটামোটি আটটা থেকেই রোদ শুরু হয়ে যেত। আমি যেহেতু গরম একটু কম সহ্য করতে পারি... সে জন্য আমরা কখনও তখন তাওয়াফ করতাম না।

মধ্যদুপুরে, মোটামোটি সাড়ে এগারোটা থেকে আবার ভিড় কমে যেত। তখন প্রচন্ড রোদ থাকতো, মক্কার রোদ, মেঘহীন আকাশ, পুরাপুরি শুষ্ক, মরুভূমির রোদ... সাদা পাথরের টাইলসগুলো তখন তেঁতে থাকত। সেই সময়টায় বড় বড় গ্রুপগুলো তাওয়াফ করতো না, কারণ একটা গ্রুপে অনেক বয়সের আর ক্ষমতার মানুষ থাকে। তখন তাই গরমটা উপেক্ষা করা গেলে বেশ শান্তিতে তাওয়াফ করা যেত! রোদটা একটু পড়ে আসলেই আবার চত্তরে প্রচন্ড ভিড় শুরু হয়ে যেত... তখন আমি আর তাওয়াফ করতে পারতাম না ওখানে। একেবারে ছাদে চলে যেতাম। ছাদে খুব জোরে তাওয়াফ করতেও আমার লাগতো দেড় ঘন্টা! তার মানে এক কিমি হাঁটতে যদি পনের মিনিট লাগে, তাহলে দেড় ঘন্টায় তিন কিমি হাঁটা!!! কিন্তু সত্যি বলতে কি, ভিড়ে এদিক সেদিক থেকে গুঁতা খাওয়ার চেয়ে ছাদে তিন কিমি হেঁটে তাওয়াফ করতেই আমার অনেক বেশি শান্তি লাগত!

রাত দশটা থেকে মোটামোটি আবার ফাঁকা হয়ে যেত, কারণ তখন কোন গ্রুপ তাওয়াফ করতো না, আর যারা দূরের হোটেলে থাকেন, তারা চলে যেতেন। কিন্তু আমরা চেষ্টা করতাম রাত দশটা থেকে ঘুমানোর, সে জন্য ওই কম ভিড়ের সময়টা আমরা সব সময় মিস করতাম! আমাদের পরিচিত একটা সাউথ আফ্রিকান দম্পত্তি সারা দিন নামাজের ফাঁকে ফাঁকে ঘুমিয়ে নিত, তারপর রাতে এসে একবারে দৌঁড়ে দৌঁড়ে আধা ঘন্টায় এক একটা তাওয়াফ করে অনেকগুলো তাওয়াফ এক সাথে সেরে নিত!

ওই যে বললাম, ছাদে দুরত্ব বেশি বলে একটা তাওয়াফ করা মানে তিন কিমি হাঁটা! আর কাবার কাছ দিয়ে, চত্ত্বরে তাওয়াফ করা মানে ভিড়ের মধ্যে অন্তত এক ঘন্টা হাঁটা! কাবার কাছে গেলে দিনে একটা বা দুইটা তাওয়াফে ঠিক তৃপ্তি আসে না, আরও করতে ইচ্ছা করে। ধরুন, কাবার চত্ত্বরে হাঁটতে এক কিমি হাঁটা লাগল, তারপরেও এক দিনে তিনটা তাওয়াফ করতে হাঁটা লাগবে—
ছাদে একটা তাওয়াফ = ৩ কিমি
চত্ত্বরে দুইটা তাওয়াফ = ২ কিমি
হারাম থেকে তিন বার হোটেলে যাওয়া আসা (আমাদের জন্য ছিল) = ৩ কিমি

তারপর তো আছেই নামাজের আগে পরে বিশাল মসজিদুল হারামের এপাশ থেকে ওপাশে যাওয়া! ওই হাঁটাগুলো বাদ দিয়েই অনায়েসে ৮ কিমি হাঁটা হয়ে যাচ্ছে!

সুতরাং রীতিমত দুধর্ষ রকমের শারিরীক পরিশ্রম যায়! তাছাড়া, কোন সময়ে ভিড় কম থাকে, কোন জায়গায় ভিড় কম থাকে, এগুলো কিন্তু হঠাৎই বুঝা যায় না, বেশ এক্সপেরিমেন্ট করে, বিভিন্ন সময়ে গিয়ে গিয়ে, বিভিন্ন জায়গায় তাওয়াফ করে আস্তে আস্তে বুঝতে হয়। শুধুমাত্র তাওয়াফের উদাহরণটুকু নিলেই বুঝা যায়, হজ কেন অল্প বয়সে করা উচিত, হাড্ডিতে জং ধরে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত না! কিন্তু তবু, তবুও লাখ লাখ মানুষের মধ্যে চল্লিশের নিচে খুব অল্প সংখ্যক মানুষকেই পেয়েছি, থুড়থুড়ে বুড়িদের দেখেছি, ছেলের পিঠে চড়ে হজ করছে, ভাড়া করা হুইল চেয়ারে হজ করছে, ভাড়া করা মানুষ নিয়ে ঠেলে বেড়াচ্ছে, মানুষ খুঁজছে যে টাকার বিনিময়ে হলেও পাথর ছুঁড়ে দিবে, আর তীব্র আফসোস করতে করতে বলতে শুনেছি, “ভেবেছিলাম সব গুছিয়ে হজ করব, কিন্তু এখন বুঝি, বুড়া মানুষের জন্য হজ না!”

আমরা প্রতিদিন ৮ কিমি (কখনও আরও বেশি) হেঁটে ঘরে ফিরতাম ক্লান্ত হয়ে, তারপরে একটা গোসল করে মাত্র চার ঘন্টার ঘুম দিয়েই সকাল বেলা উঠে দেখতাম শরীর পুরা ঝরঝরে! বাঙালী মেয়ে তো, কখনও স্পোর্স্ট করি নি, কিন্তু সত্যি বলছি, হজের এক মাস যতটা ঝরঝরে লেগেছে, যতটা সুস্থ ছিলাম, আমার জীবনে খুব অল্প সময়ই সেরকম সুস্থ ছিলাম! অ্যাড্রানালিন রাশ কাকে বলে, কেন মানুষ জিমে ঘন্টার পর ঘন্টা এক্সারসাইজ করে, সেটা সেই এক মাসে বুঝেছিলাম! তাওয়াফগুলো আমার কাছে কষ্টের মনে হয় নি সত্যিই! স্পিরিচুয়াল প্রশান্তি তো সবচেয়ে বড় পাওনা হিসেবে ছিলই!

তাই বলি, সুযোগ থাকলে দেরি করবেন না প্লীজ!

3 মন্তব্য:

saaba said...

Allah apnake diye lekhachchen amar moton manushder jonnoi.:)
Etto shundor likhe jan, shobdogulo pura absorbed hoye jaay!

Du'a korben please apu, amader Umrah korar plan achey.

TanCurve said...

inshallah, allah apnader niyot kobul koruk, onek borkotmoy umrah korar towfik din! doa korben amader jonno apu :)

saaba said...

Obosshoi korbo! amader dui boner Graduation er gift er moto beparta. Amma khubbi excited shob kichu niye.
I cant wait see it all by myself :-) once again JazakAllah Khair