Sunday, March 20, 2011

হৃদয়ের পথে ৯: ইন্সপায়রেশনাল এবং রোমান্টিক


কাবা পৃথিবীর একমাত্র ঘর যা তাওয়াফ করা কখনও বন্ধ হয় না। আমরা নামাজে দাঁড়ালেও ফেরেশতাদের তাওয়াফ চলতে থাকে। এই ব্যাপারটা আমার আগে কখনও সেরকম সিগনিফিক্যান্ট মনে হয় নি, প্রথম যেদিন ফজরের নামাজের পরে সূর্যোদয়ের সময়ে তাওয়াফ করলাম, সেদিনের আগে। সেদিন ছাদে ফজরের নামাজ পড়েছিলাম। ছাদ থেকে নেমে এসে পাঁচ নম্বর গেইটের বরাবর, ঠিক রুকন ইয়ামীনের কাছে সিঁড়ি দিয়ে নামছিলাম। কাবার কালো চাদরের একটুখানি আর মসজিদুল হারামের ধূসর দেয়ালের এখানে সেখানে তখন সকালের সোনালী আলোয় ভরপুর। মেঘহীন আকাশটা স্নিগ্ধ নীল রং। একটু একটু ঠান্ডা বাতাস বইছে, সাদা পাথরের টাইলসগুলো তখনও একদম ঠান্ডা। চারিদিকে স্নিগ্ধতার ছড়াছড়ি। সকালের সতেজ মন নিয়ে আল্লাহকে পাওয়ার আশায় চুপচাপ তাওয়াফ করে যাচ্ছে এক দল মানুষ।
এই দৃশ্যের সৌন্দর্যটুকু পুরাপুরি উপলব্ধি করার আগেই দেখলাম ব্যাপারটা। এক ঝাঁক কালো ছোট ছোট পাখি কোথা থেকে উড়ে এসে হঠাৎ ঠিক অ্যান্টি ক্লক ওয়াইজ ডিরেকশনে কয়েকবার উড়ে গেল কাবার উপর দিয়ে! একটা দুইটা পাখি কোন নির্দিষ্ট দিকে ঘুরলে চোখে পড়ে না, কিন্তু এক ঝাঁক পাখির গতিবেগ খুব স্পষ্ট থাকে! ওরা চলে যেতেই দেখলাম আরেক দল পাখি আসল! চিক চিক শব্দে কি যেন বলতে বলতে কয়েকবার ঘুরে গেল কাবার উপর দিয়ে, অ্যান্টি ক্লক ওয়াইজ, ঠিক যেভাবে তাওয়াফ করতে হয় সেভাবে! দৃশ্যটা এত সুন্দর, এতই সুন্দর ছিল, সকালের সোনালী রোদ, অ্যান্টি ক্লক ওয়াইজে ঘুরতে থাকা লাখ মানুষ, অ্যান্টি ক্লক ওয়াইজে ঘুরতে থাকা অনেকগুলো কালো পাখি, আর মাঝখানে পৃথিবীর প্রাচীনতম উপাসনালয়... আমার মনে হচ্ছিল পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ন্যাচারাল ইভেন্ট ক্যামেরায় ধরে রাখতে তখন আমার শুধু একটা ক্যামেরা লাগত, সাবজেক্ট, লাইটিং, সবই পারফেক্ট ছিল!

আমার সাইন্টিফিক মনটা সেদিন আপ্লুত হলেও বুঝেছিল, বিশ্বাসীদের মন এরকমই। হঠাৎ ঘটে যাওয়া ব্যাপারকেও আলৌকিক ভেবে নেয়, তাই পাখিদের সাধারণ উড়ে যাওয়াটাকেও তাওয়াফ মনে হয়। কিন্তু জানেন কি, আমরা প্রতিদিন সূর্যোদয়ের পর পর তাওয়াফ করতাম, আর প্রতিদিন এই ব্যাপারটা দেখতাম! আর প্রতিটা দিন আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম সিঁড়ির উপর থেকে। নও অনেক পাখি চিনে, কিন্তু বলতে পারল না এটা কি পাখি। আমাদের দু,জনকেই পাখিগুলো দেড় হাজার বছর পিছনে নিয়ে যেত... পাখিগুলোকে দেখলেই খুব আবাবিল আবাবিল মনে হতো!

হজ নিয়ে যখন পরে হাজীদের সাথে কথা হচ্ছিল, তখন দেখলাম অনেকেই ব্যাপারটা খেয়াল করেছে! মজার ব্যাপার হচ্ছে, হজ নিয়ে অনেক পড়েছি, কিন্তু কোথাও পাই নি এটা!

সেই মুহূর্তটার কোন ছবি তুলি নি। একদিন সূর্যোদয়ের সময় ছাদ থেকে তোলা নিচের ছবিগুলো... খুব খেয়াল করলে দেখা যাবে আমাদের আবাবিলগুলোকে!



প্রথম দিকে বলেছিলাম, ইসমাইল ডেভিডস পই পই করে বলে দিয়েছিলেন সূরা হজ পড়তে। কিন্তু সূরা হজের বেশির ভাগ জুড়েই আখিরাতের কথা, আর কেয়ামতের কথা। কেন? ইসমাইল ডেভিডস ব্যাখ্যা করেন নি, বলেছিলেন, ভাবতে থাকো, তুমি নিজেই বুঝতে পারবে।

বুঝেছিলাম প্রথম যেদিন দুপুরবেলা তাওয়াফ করলাম। তখন মাথার উপরে সূর্য্য। আকাশে বিন্দুমাত্র মেঘ নেই। কাবার চত্ত্বরে মানুষ আছে অনেক, কিন্তু ভিড়টা খুব সহজেই চলে যাচ্ছে, এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকছে না। পায়ের নিচে তেতে থাকা সাদা টাইলসের উপর পা বাড়িয়ে সাহস করে তাওয়াফ শুরু করেই দিলাম। সে কি গরম.. চারিদিকে সবাই দরদরিয়ে ঘামছে, তীব্র রোদে পুড়ছে, কিন্তু কোন উচ্চবাচ্য নেই, মুখে বিরক্তি নেই... সবাই মাথা নিচু করে নিজের মত করে ঘুরে যাচ্ছে, আল্লাহকে ডাকছে, নিরব কান্নায় বুক ভাসিয়ে দিচ্ছে... নাকের পানি চোখের পানি মিলে একাকার, বুড়া লোকটার দাঁড়ি ভিজে যাচ্ছে, সবল আফ্রিকান জোয়ান ছেলেটা হাউ মাউ করে কাঁদছে... সেদিন আমি আল্লাহর সামনে বিনয় দেখেছিলাম, আত্মসমর্পন দেখেছিলাম। সেদিন আমি ইসমাইল ডেভিডসের বলা ওই কথাটার অর্থ খুঁজে পেয়েছিলাম, “হজ ইজ দ্যা মোস্ট ইনডিভিজুয়াল জার্নি এভার”... হাজার মানুষের ভিড়ে আল্লাহর সামনে আমি সত্যিই একা দাঁড়িয়েছিলাম সেদিন।

আখিরাতে যে দুজন মানুষের পারষ্পরিক বিচার সবচেয়ে আগে হবে, তারা হচ্ছে স্বামী এবং স্ত্রী। সেদিন, যখন কিয়ামতের উপলব্ধি হচ্ছিল, তখন আমার হাত ধরে ছিল নও। যেই মানুষটাকে পাশে নিয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে একদিন। যেই মানুষটার সাথে আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে আমি ঝগড়া করতে চাই না, বরং তীব্র কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই। সেদিন, যেদিন সব সত্য বের হয়ে আসবে, নিজের ভিতরে লুকানো গোপনতম অনুভূতিগুলোও...

কাবার চত্ত্বরে তাওয়াফ করতে হলে প্রচন্ড ভিড়ে তাওয়াফ করা খুব কষ্ট হয়ে যেত বলে নও সব সময় আমাকে পিছন থেকে দুই বাহু দিয়ে আগলে ধরে রাখত। ও হাতগুলো আমার সামনে এনে এমন ভাবে রাখত যেন আমার সামনে কোন পুরুষ থাকলে খুব ভিড়ে তাদের গায়ে আমাকে গিয়ে পড়তে না হয়, বাম্পারের মত প্রটেক্ট করতো আমাকে! কখনও কখনও আবার হঠাৎ ভিড় বেড়ে গেলে রীতিমত 'পিষ্ট' হতে হতো মানুষের চাপে। সেই সময়টায় নও আমার চারপাশে একটা 'বলয়' তৈরি করে রাখত, যেন বিন্দুমাত্র কষ্ট না হয় আমার। ও আমার চেয়ে ভালোই লম্বা বলে ওকে দেখে মনে হতো না যে ওর কষ্ট হচ্ছে খুব, কিন্তু খুব ভিড়ের মধ্যে ব্যাপারটা খুব সহজও হওয়ার কথা না! অনেক ভিড়ে তাওয়াফ করেও আমি সব স্পর্শ বাঁচিয়ে তাওয়াফ করে এসেছি! অবশ্য আমি আর নও একা ছিলাম না এদিকে, প্রচুর দম্পত্তিকে দেখেছি এভাবে তাওয়াফ করতে। আবার কত দেখেছি স্বামীরা আগে আগে দৌঁড়াচ্ছে, পাঞ্জাবীর কোণা ধরে কোন রকমে পিছু পিছু দৌঁড়াচ্ছে স্ত্রী (বিশেষত ভারতীয় উপমহাদেশীয় স্ত্রীরা), স্ত্রী আস্তে হাঁটবে বলে স্ত্রীকে নিজের মত করে তাওয়াফ করতে বলে দিয়েছে, অথচ, স্ত্রীকে একটু সাহায্য করলে সওয়াব নিশ্চয়ই কমতো না!

তাছাড়া, এতটা কাছাকাছি তাওয়াফ করায় আল্লাহর সামনে নিজেদের যতটা ভালনারেবল অবস্থায় পেয়েছি, সেভাবে আগে কখনও পাই নি। পুরা দুই বছরে এক সাথে থেকেও আমি নওয়ের চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়তে দেখি নি, ওর খুব দুর্বল মুহূর্তে, যখন ওর সবচেয়ে প্রিয় মানুষ, ওর মাকে ছেড়ে আসছে, তখনও না। ওকেই যখন দেখলাম তাওয়াফ করতে করতে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পন নিয়ে অনর্গল কাঁদতে, তখন আমি আমার সব দোআ ভুলে গিয়ে দোআ করছিলাম আল্লাহ যেন নওয়ের সব দোআ কবুল করে নেয়... এরকম একটা মুহূর্তে কত কিছু যে নতুন করে তৈরি হয়!

তাওয়াফ ব্যাপারটা তাই আসলে বেশ রোমান্টিক। কেউ যেহেতু কারও দিকে তাকায় না, কাবা এলাকা তাই আশ্চর্য রকমের আধুনিক এবং মুক্ত! কাবার ছাদে তুলেছিলাম নিচের ছবিটা, স্বামীর মাথা কোলে নিয়ে কোরআন তেলওয়াত করছেন স্ত্রী।

পৃথিবীর সবচেয়ে কনজারভেটিভ মুসলিম দেশে এবং পৃথিবীর প্রাচীনতম মসজিদে যা সম্ভব, পৃথিবীর সবচেয়ে লিবারেল দেশের সবচেয়ে মডার্ন মসজিদেও কি তা ভাবা যায়!

সোবহানাল্লাহ, মসজিদুল হারামে প্রতিদিন এরকম কত কি যে দেখে আপ্লুত হতাম, ইন্সপায়ারড হতাম! একদিন খুব ক্লান্ত হয়ে তাওয়াফ করার সময় দেখলাম আমাদের বয়সেরই একটা আফ্রিকান ছেলেকে, ওর বাঁ পা-টা ডান পায়ের চেয়ে অন্তত এক বিঘত ছোট এবং একদিকে বাঁকানো। ও এভাবেই এক পা টেনে টেনে, সামনে পিছনে দুলে দুলে তাওয়াফ করে যাচ্ছে প্রচন্ড ভিড়ের মধ্যে... ছেলেটের গায়ে ইহরাম ছিল না, তার মানে বাধ্যতামূলক তাওয়াফ ছিল না ওটা...

আরেকদিন ছাদে তাওয়াফ করছিলাম, তেমন ভিড় ছিল না। পিছনে লাঠির শব্দ শুনে সরে দাঁড়িয়েছিলাম। দেখি লাঠি হাতের মহিলাটার আপাদমস্তক কালো বোরখা পরা, চোখগুলোর উপরেও কালো কাপড়, এক হাত দিয়ে আগলে ধরে আছে পাশের পুরুষের বাহু। ওর লাঠির দিকে চোখ যেতেই ধাক্কা খেলাম... অন্ধদের সাদা লাঠি। বের হওয়ার সময় আবারও দেখেছিলাম ওঁকে, পায়ে জুতা পরিয়ে দিচ্ছিলেন সাথের পুরুষ সাথী।

দু ধরণের মানুষ দেখলে আমি অনেক্ষন তাকিয়ে থাকতাম। শিশুরা--অনেক শিশুদের দেখেছি বাবার কাঁধে চড়ে, মায়ের পিঠে কাপড়ের পোটলায় ঝুলে ঝুলে তাওয়াফ করছে, কিন্তু কোন বাচ্চাকেই কাঁদতে দেখলাম না, আর একেবারে বুড়া বুড়া মানুষগুলো যখন তাওয়াফ করতে গিয়ে হু হু করে কাঁদতে থাকত। ওদেরকে দেখে বুঝতাম, ওরা যেভাবে গত জীবনের অর্থ বুঝতে পারছেন, যেভাবে আল্লাহর কাছে সত্যিকারভাবে আত্মসমর্পন করছেন, যেভাবে সামনে আসতে থাকা বাস্তবতা মৃত্যুকে দেখছেন, যেভাবে ডেসপারেইটলি চাইতে পারছেন, আমি পারতাম না তার কিছুই...

0 মন্তব্য: