হজের জন্য মক্কায় পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত আমার একেবারেই সময় ছিল না একটু অতিরিক্ত পড়াশোনা করে নেয়ার। সেমিনার আর কোর্সে গিয়েছি ঠিকই, কিন্তু নিজে বসে বসে যে পড়াশোনাগুলো ভিতরে ঢুকিয়ে নিব, সেটা করতে পারি নি। মক্কায় পৌঁছানোর পরে সময়টা পাব জেনেই আগে থেকেই হজ সম্পর্কিত বই নিয়েছিলাম আর একান্তই
নিজের জন্য কিছু অতিরিক্ত জিনিস নিয়েছিলাম।
সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল অবশ্যই ইংরেজি অনুবাদ সহ ছোট্ট কুরআন। আর একটা লিস্ট—কুরআন অবতীর্ন হওয়ার ধারা। কুরআন যেভাবে রাসুল (সা) এর কাছে এসেছিল, আমরা কুরআনকে সেভাবে পড়ি না, রাসুল (সা) পরে আল্লাহর নির্দেশে কুরআনকে অর্থবহ ধারা অনুযায়ী সাজিয়েছিলেন। কিন্তু কুরআন যেভাবে এসেছিল, সেই ধারাটা ঐতিহাসিক পটভূমি হিসেবে দারুণ।
আমি মক্কায় আসা সূরাগুলোর আর মদীনায় আসা সূরাগুলোর ক্রমধারা করা লিস্ট আলাদা করে নিয়েছিলাম। মক্কায় আসা সূরাগুলো মক্কায় পড়েছিলাম আর মদীনার সূরাগুলো মদীনায়! আরবি কুরআন তো পড়তেই হবে সওয়াবের জন্য, কিন্তু বুঝাটা তার চাইতেই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারনত মানুষ অনেকটুকু আরবি পড়ে তারপরে অর্থ পড়ে। কিন্তু আমি একটা একটা করে আয়াত প্রথমে ইংরেজি অনুবাদটা পড়ে তারপরে আরবিতে পড়তাম। তাতে আরবি অংশটুকু পড়তে আগ্রহ লাগত, অর্থ জানার কারণে দু্ই একটা শব্দও ধরে ফেলতে পারতাম।
মসজিদুল হারামে বসে মক্কায় আসা সূরাগুলো পড়া শুরু করলাম... সেই কাবা যার সামনে সিজদা দেয়া অবস্থায় রাসুল (সা) এর পিঠের উপর উটের নাড়িভুড়ি চাপিয়ে দেয়া হতো, যার আশে পাশে কুরাইশরা প্রস্তাব করতো রাসুলকে বিপুল ধন সম্পদের মালিক করে দিবে যদি তিনি শুধু রাজি হন যে এক বছর তিনি মুসলিম থাকবেন আর এক বছর কুরাইশদের ধর্ম পালন করবেন... সেই কাবা যার আশে পাশে মানুষ জানতে চাইতো আল্লাহর বংশধারা সম্পর্কে, অহংকারী আবু লাহাব আর উম্মে জামিল কথার বিষ ছড়াতো, সেই কাবা যেখানে আবাবিলরা এসেছিল, হাতির পাল এসে সিজদায় লুটিয়ে পড়েছিল। মক্কার পাহাড়গুলো দেখে ভাবতাম, কোন পাহাড়ে দাঁড়িয়ে আল্লাহর রাসুল কাফিরদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন ওপাশে শত্ররা দাঁড়িয়ে আছে বললে ওরা বিশ্বাস করবে কি না? একজনের সূত্রে জানতে পেরেছিলাম রাসুলের চাচাতো বোন উম্মে হানীর ঘরের অবস্থান, ওখানে থাকা অবস্থাতেই মিরাজে গিয়েছিলেন রাসুল (সা)! সেই মিরাজ, যেটার কথা জানার পরে, “অবাস্তব গল্পসল্প” যুক্তির ভিত্তিতে কত কে ইসলাম থেকে দূরে সরে গিয়েছিল, শুধু আবুবকর অটল ছিলেন। সেই মক্কা, যেখানে কুরআনের অদ্ভূত সুন্দর বাক্যগুলো শুনে রাসুলকে কবি বলা হতো, আইডিয়াগুলো কথা শুনে তাঁকে পাগল বলা হতো, আবার কথাগুলোর শক্তি দেখে তাঁকে জাদুকর বলা হতো। কাবা, যেখানে আল্লাহ অসংখ্য ছোট ছোট সুন্দর সুন্দর বাক্যে আখিরাত
কে জীবন্ত করে এনেছিলেন মানুষের সামনে।
যেখানে কুরআন এসেছিল সেখানে কুরআন পড়তাম আর সব চরিত্র আর ঘটনাগুলো প্রান পেয়ে ফিরে আসত আমার কাছে। এখনও কুরআনের একই সূরাগুলো পড়লে সেই সময়গুলোর কথা মনে পড়ে...
সাথে আরও নিয়েছিলাম আল্লাহর নিরানব্বইটা গুণগত নাম। আগে যখন দেখতাম বাসায় বাসায় নামগুলো বাঁধাই করে সাজানো, তখন ব্যাপারটা কেমন খেতু খেতু লাগতো। সেই অনুভূতি থেকেই হয়তো, আল্লাহর নামগুলোর প্রতি ভালোবাসা আমার স্বাভাবিক ভাবে আসে নি। পুরা দুই দিন ইয়াসীর ফাজাগার মুখোমুখো সেমিনারে যখন একে একে নামগুলোর পরিচয় পেলাম, তখন আস্তে আস্তে ভালোবাসা তৈরি হলো। ইয়াসীর ফাজাগা থিওলজী পড়েছেন। সে জন্যই তিনি ব্যাখ্যা করে বলতে পারলেন আল আফু আর আল গাফুর পার্থক্য। দুটোই বাংলায় ক্ষমাশীল। কিন্তু “আফু” শব্দটার আরবি শব্দমূল এভাবে ব্যবহৃত হয়—কোন সমুদ্র সৈকতে হেঁটে গেলে যখন পায়ের ছাপ তৈরি হয়, আর ঢেউ এসে সেই ছাপটাকে এমন ভাবে ধুঁয়ে মুছে নেয় যে সেখানে ছাপ ছিল তা বুঝাই যায়। আল আফু, আমাদের সব ভুলগুলো সেগুলোর ইম্প্যাক্ট সহ এমন ভাবে ধুঁয়ে মুছে নিতে পারেন, যে বুঝারই উপায় থাকে না।
আর গাফুর শব্দমূল ব্যবহৃত হয় এভাবে—কোন এক জায়গায় এত মানুষ হলো যে সমস্ত এলাকাটা মানুষে মানুষে ঢেকে গেল, শেষ মেষ মাঠটা বালুর না ঘাসের, তাই আর দেখার উপায় নেই। আল গাফুর আমাদের ভুলগুলো এমন ভাবে ঢেকে ফেলতে পারেন, যে নিজের কাছেও সেই ভুল সময়টা অনেক দূরের কিছু হয়ে যেতে পারে।
ক্ষমাশীল তো ক্ষমাশীলই, কিন্তু শুধু গভীর অর্থগুলো জানার কারণে নামদুটো ব্যবহার করার অর্থই বদলে গেল আমার কাছে। এভাবে প্রতিটা নামের শব্দমূল, কুরআনে কোথায় এসেছে, এগুলো বিশদ পড়ে বুঝলাম, রাসুলের যুগে আরবের মানুষগুলো হয় সব জেনেশুনে, আল্লাহর ভীষণ কম্প্রিহেনসিভ একটা চেহারা চিনে তারপরে ইসলামে এসেছিল না হয় সব বুঝে শুনে কম্প্রিহেনসিভ আল্লাহ আর তাঁর ইসলামকে ছুঁড়ে ফেলেছিল। আমাদের সময় এই কাজটা কয় জন করে আমি জানি না!
আল্লাহর নামগুলো আমার এখন খুব প্রিয়, নামগুলো জানার কারণে আল্লাহর পরিচয়টাই পুরা বদলে যায়, আল্লাহকে অনেক বাস্তব আর কাছের মনে হয়। দোআ করার সময় মাঝে মাঝে বিভিন্ন নামে আল্লাহকে ডাকি, সে জন্যই লিস্টটা সাথে নিয়েছিলাম।
আর নিয়েছিলাম “বুলুগ আল মারামের” হজ সম্পর্কিত সমস্ত হাদীসের ফটোকপি। বুলুগ আল মারামের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানে পক্ষে বিপক্ষে, বড় হাদীস, ছোট হাদীস, সবল হাদীস, দুর্বল হাদীস নানা রকমের হাদীস একসাথে করা, তাই বেশ সার্বজনীন একটা ধারণা পাওয়া যায়। হাদীসগুলো পড়ে রাসুল কিভাবে হজ করেছেন, তার পুরাপুরি ধারণা পেতে চাচ্ছিলাম। রাসুল একবারই হজ করেছেন, সুতরাং এই নিয়ে খুব বেশি ক্যাচালের সুযোগ নেই!
এবং অবশ্যই, ফোরট্রেস অফ দ্যা মুসলিমস (হিসনুল মুসলিম)। বইটায় রাসুল (সা) এর করা দোআগুলো এক সাথে করা। ছোট্ট এই বইটা আমার ভীষণ প্রিয় কারণ বইটা পড়লে বুঝা যায় রাসুল আর আল্লাহর সম্পর্কটা কিরকম কাছাকাছি ছিল, গল্পের বইয়ের সংলাপের মত। এবং এমন না যে এগুলো এক পাক্ষিক সংলাপ, কারণ এর ফলগুলো আমরা রাসুলের জীবনে দেখেছিলাম! আল্লাহর সাথে আন্তরিক সংলাপে আমারও কখনও মনে হয় নি আমি একাই কথা বলছি!
মক্কায় এবং মদীনায়, দুটো হারামেই প্রতিটা, প্রতিটা নামাজের শেষে জানাজার নামাজ হতো। জানাজার নামাজের সওয়াবকে রাসুল (সা) দুই উহুদ পরিমান সওয়াব বলে ঘোষনা করেছিলেন। এত সওয়াব, তাও আবার হারামে, তবুও দেখলাম ওখানে অনেক মেয়েরাই জানাজার নামাজ পড়ে না। কি সহজেই সওয়াবটাকে চলে যেতে দেয়! আমার চেনা খুবই ধার্মিক একটা মেয়েকে জিজ্ঞাসা করেই বসলাম, পড়ে না কেন। ও বললো, ওর ভারতীয় মা খালারা কখনও জানাজার নামাজ পড়ে না, বরং জানাজার নামাজ পড়া মেয়েদের জন্য অন্যায় মনে করে! সিডনীতে ফিরে রিসার্চ করে দেখলাম, কট্টর হানাফী, কট্টর সালাফী এবং উদারপন্থী স্কলাররা সবাই বলছেন, জানাজার নামাজ মেয়েদের জন্যও। তাহলে এই ধারণা কোথা থেকে শুরু হলো কে জানে! সমাজ নাকি ধর্মের কথা বলে মেয়েদের পার্থিব দিক দিয়ে দাবিয়ে রাখতে চায়, শুধু কি তাই! সুযোগ পেলে ধর্মীয় দিক দিয়েও যে বঞ্চিত করা শুরু করে!

মৃতদের কেউ কেউ থাকতো হাজী, কেউ স্থানীয়। এক সাথে দশ বারো জনেরও জানাজা হতো (মসজিদুল হারামে সাতটা মৃতদেহ বয়ে নেয়ার ছোট্ট একটা ভিডিও)। মৃতদেহগুলোকে ফরজ নামাজ শেষ হলে সাথে সাথে মসজিদে ঢুকানো হতো। আবার জানাজার সাথে সাথে বের করে আনা হতো। আমি একবারই দেখেছিলাম মুতদেহগুলোকে মসজিদ থেকে বের করার দৃশ্য... মেয়েদের মুখ ঢাকা থাকতো আর ছেলেদের মুখ খোলা। কোন দেহ একেবারেই পাতলা, খাটিয়ার উপরে যে কিছু আছে, হঠাৎ দেখে বুঝার উপায় নেই। কোনটা আবার বিশাল, ঢাকা মুখ আর উঁচু পেট দেখে হঠাৎ চমকে যেতে হয়, আর কোন প্রান ছিল না তো ওখানে! আর একেবারে বাচ্চাদের ছোট্ট প্রানহীন দেহ... ওরা কবরে ভয় পাবে না তো! জানাজার নামাজের দোআ তখনই প্রথম শিখেছিলাম... মনে আছে, খুব আন্তরিকভাবে দোআ করতাম তখন, ক্ষীন আশায়, আমার মৃত্যুর পরেও কোন এক ভিনদেশী অচেনা মানুষ আমার জন্য হয়তো এভাবেই মন প্রান দিয়ে চাইবে আল্লাহর কাছে!
-----------
ছবিসূত্র: চিংক্সের ফ্লীকার
0 মন্তব্য:
Post a Comment