সেদিন ঘরে ফিরতে দেরি হয়ে গিয়েছিল। সবার খাওয়া দাওয়া শেষ, অগত্যা টিভির সামনে একা বসে খেতে খেতে চ্যানেল ঘুরানো এবং এসবিএসের বিদেশী মুভ্যিতে আটকে যাওয়া। তুর্কি মুভ্যিটার নাম "তাকভা" (তাকওয়া), একজন খোদাভীরু সাধারণ মানুষ মুহররেম, নিজের মত করে আল্লাহকে যতটুকু বুঝে, মানার চেষ্টা করে। মুহররেমের সততা দেখে তাকে যখন বড় হুজুর নিজে ডেকে দরগার একাউন্টেন্ট হিসেবে বেছে নেন, তখন থেকেই মুহররেমের সাজানো গোছানো বিশ্বাসী মনটা উল্টে পাল্টে যাওয়া শুরু করে। খুব সুন্দর করে বলতে পারা আল্লাহ-অলা মানুষগুলোকে যখন কাছ থেকে দেখা শুরু করে, তখন অনেক কিছু মানতে কষ্ট হয় ওর। দরগা এবং দরগার সাথের মাদ্রাসার খরচ উঠে আসে কিছু বাড়ি ভাড়া থেকে। যখন একমাত্র জীবিকা অর্জনকারী স্বামী অসুস্থ বলে একটা পরিবার ভাড়া দিতে পারে না, তখন তাকে উঠে যাওয়ার নির্দেশ দেয় দরগা কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে মেদো মাতাল ভাড়াটিয়ে নিয়মিত ভাড়া দিয়ে যায় বলে তার হারাম টাকা নিতে দরগা-কর্তৃপক্ষের কোন দ্বিধা নেই। মুহররেম মানতে পারে না, 'আমরা আল্লাহর কথা বলছি, আমরা কি মেদো মাতালটাকে অন্য বাড়ি দেখতে বলতে পারি না? অসহায় পরিবারটাকে থাকতে দিতে পারি না?' বড় হুজুর খুব কোমল স্বরে বলেন, 'অবশ্যই পারি মুহররেম, তোমার চিন্তাটা খুব সুন্দর। কিন্তু এই দুটো ভাড়াটিয়ের ভাড়া না পাওয়ার কারণে যেই দুটো ছাত্রের বৃত্তি দেয়া বন্ধ করে দিতে হবে আমাদের, সেই ছাত্রগুলোকে তুমি বেছে দিও মুহররেম।' মুহররেম ভুল বুঝে, মাফ চায়।
***
"আজ অবধি মনের ভেতর আমরা লালন করে চলছি মধ্যযুগীয় এক বিশ্বাস। নিজের খোদা ব্যতীত অন্য খোদার সমর্থকদের জন্য রয়েছে আমাদের অপরিসীম ঘৃণার ভাণ্ডার। হুরবিশিষ্ট বেহেশতের ফুলেল বাগানে নিজেদের রাখলেও, নিজের মতোই দুইটি চোখ, একটি নাক, একটি হৃৎপিণ্ড বিশিষ্ট ভাইকে মনে করি নরকের কীট। এই নরকের কীটদের জন্য আমাদের ভালোবাসার প্রয়োজন নেই। কারণ আমাদের খোদা তাদের ভালোবাসেন নি। তিনিই তাদের অপরিসীম ঘৃণা করেন, আমরা তো কোন ছাতার মাথা। হ্যাঁ! লোকচক্ষুর খাতিরে আমরা তাদের সাথে মিশি, তবে "তাদের থেকে আমি শ্রেষ্ঠ" এই কথা আমরা ভুলে যাই না। আমরা মডারেটরা এই দর্শনে বিশ্বাস করি, যদিও আমরা নিজেদের হাত রঞ্জিত করি না। আমাদের নীরব সমর্থনের উপর দাঁড়িয়ে নিজের ভাইয়ের রক্ত রঞ্জিত হওয়ার কাজ করে আমাদের দলের স্পেশাল ফোর্স। আমরা প্রতিবাদ করি না, করলে আমাদের বুকিং দেওয়া বেহেশতের প্লটটা যে বেদখল হয়ে যেতে পারে।" (সূত্র)
***
কালকে হাবিব ওমরের একটা লেকচারে গিয়েছিলাম। এসবিএস, এখানকার অন্যতম বড় চ্যানেলের বিশিষ্ট জার্নালিস্ট, মার্ক ডেভিস গিয়েছিলেন ইন্টারভিউ নিতে। মার্ক ডেভিস কিছু প্রশ্ন করেছেন, শ্রোতারাও কিছু প্রশ্ন করেছেন। মার্ক ডেভিস রাজনৈতিক প্রশ্ন করেছেন মূলত, কিন্তু, হাবিব ওমর তাঁর সূফী দর্শনের জন্য বিখ্যাত। সুতরাং, হাবিব ওমর রাজনৈতিক প্রশ্নগুলোর উত্তর খুবই তাত্ত্বিক ভাবে দিলেন, যেটাকে হয়তো দালাই লামার অহিংস মতামতের মত টাঙিয়ে রাখা যাবে, কিন্তু প্র্যাক্টিকেলি, আম জনতার জন্য সলিড এবং ট্যানজিবল উত্তর না। যেমন যখন প্রশ্ন করা হয়েছে, অস্ট্রেলিয়ার মুসলিম আর অমুসলিমদের মধ্যে যে একটা দৃশ্যমান ভাগাভাগি আছে, এটার ব্যাপারে তাঁর কি মত এবং এটা দূর করতে হলে কি করতে হবে? তিনি উত্তর দিলেন, তিনি যতটুকু দেখেছেন এবং বুঝেছেন, এই ভাগাভাগিটা শুধু মুসলিম আর অমুসলিমের মধ্যে না, অনেকগুলো ভিন্নজাতি একসাথে থাকতে গেলে সব সময়ই এরকম হয়।
নারী দর্শকদের থেকে দুটো প্রশ্ন আসলো, একটা প্রশ্ন করেছে সিডনী গালর্স হাইস্কুলের একটা মেয়ে--মুহাম্মদ (সা) কিভাবে নয় বছরের আয়েশাকে বিয়ে করলেন আর আরেকটা প্রশ্ন ছিল একজন আইনজীবি নারীর কাছ থেকে—ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের প্লাটফর্মে স্ত্রী প্রহারের আয়াত দিয়ে ইসলামকে বিচার করা হয়, এ ব্যাপারে তাঁর কি মতামত?
***
আগে একসময় এগুলো নিয়ে খুব চোটপাট করতাম, বলতাম। এখন বলি না। আমাকে কেউ ব্যক্তিগত ভাবে এগুলো জিজ্ঞাসা করলে জবাব দেই। অন্যদেরকে কনফ্রন্ট করি না। কি বলে কনফ্রন্ট করব, ইসলামে এই আছে সেই আছে? থাকলেই কি? যতই ইসলামের পূর্ণ জাগরণ হোক, নতুন নতুন ইসলামিক টিভি চ্যানেল আসুক, চকচকে রঙিন বই বের হোক, প্রতিটা প্রশ্নের দাঁত ভাঙা জবাব জানা থাকুক, আসল ব্যাপারটা হচ্ছে, আমরা মুসলিমরা কুরআন আর ইসলামকে নিজেদের স্বার্থে “ব্যবহার” করা বন্ধ না করলে এগুলো আসতেই থাকবে।
ব্যবহারই করছি। হাদীসে আছে, "গুণাহ হচ্ছে যা নিয়ে ভিতরে অস্বস্তি হয়" (সহীস মুসলিম)।
কিন্তু আমরা, মাহররেমের মত কত শুনেছি “বৃহত্তর” স্বার্থের কথা! দুইটা খারাপের মধ্যে কম খারাপটা বেছে নেয়ার কথা! ব্যাখ্যাগুলো টানতে টানতে এক সময় এমন লিপ সার্ভিস হয়ে যায়, যে নিজের ভিতরের আর্তচিৎকারগুলো তখন অনবরত দমিয়ে রাখতে রাখতে আল্লাহ প্রদত্ত মনের ভিতরের মনটা এক সময় অন্ধ, বধির আর বোবা হয়ে যায়।
যখন ইসলাম সম্পর্কে নতুন নতুন পড়তে শুরু করলাম, তখন দেখলাম চারিদিকে একটা ইস্যুতে দাওয়াহ ম্যাটেরিয়ালের অভাব নেই, তা হচ্ছে, অন্য ধর্ম কত পঁচা আর ইসলাম কিভাবে সেরা! যেন অন্য সব কিছুকে পঁচা প্রমানিত করে ইসলামকে উপরে উঠাতে হবে, ইসলামের এতই আকাল পড়েছে! রাজ্যের অবান্তর সব প্রশ্ন নিয়ে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর সেই একই প্যাঁচাল...ওরা গরু খায় না কেন, এতগুলা দেবতা কেন, খ্রীষ্টানরা কি আসলেই একত্ববাদে বিশ্বাসী...
আমি ছোটবেলা থেকে ইসলামকে এভাবে বুঝে এসেছি—মুসলিম নাম থাকলেই বেহেস্তের টিকেট কনফার্ম না আর অমুসলিম মাত্রই কাফির না। কাফির শব্দটার শাব্দিক অর্থ হচ্ছে যে সত্য জেনে তারপরে গোপন করে, জেনে বুঝে বিশ্বাসকে গ্রহন করতে রাজি হয় না, পার্থিব জীবনের মোহে... রাসুলের চাচা আবু তালিবও মৃত্যুর সময় সব জেনে বুঝে, কাছ থেকে রাসুলের জীবনে সত্যটাকে উপলব্ধি করে, কলেমা পড়তে গিয়েও পড়েন নি এই কারণেই: “আমি এখন কলেমা পড়ে মরে গেলে সবাই বলবে আবু তালিব তার বাপদাদার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, এটা আমি সহ্য করতে পারব না।“ কুরআন পড়লে সাধারণ অবিশ্বাসী আর কাফিরদের মধ্যে পার্থক্যটা খুব স্পষ্ট হয়ে যায়।
কাফিরদের চেয়েও নিচে অবস্থান মুনাফিকদের। সূরা বাকারার প্রথম বিশ আয়াতে বিশ্বাসীদের ব্যাপারে বলা হয়েছে ৪ আয়াতে, কাফিরদের ২ আয়াতে আর মুনাফিকদের ১৩ আয়াতে!
নিচের আয়াতটা পড়ে সত্যি করে বলুন তো চমকে উঠেন নি, নিজের জীবনে আপনার এরকম মুহূর্ত আসে নি!
“যখন তারা (মুনাফিকরা) নামাজ পড়তে দাঁড়ায়, তখন খুব অনিচ্ছার সাথে দাঁড়ায়, আর শুধু মানুষ যেন তাদের দেখে সে জন্য দাঁড়ায়। তারা আল্লাহকে স্মরণ করে, কিন্তু খুব কম!” (নিসা: ১৪২)
এই আয়াতটা পড়ে খুব চমকে উঠেছিলাম, আজীবন শুনে এসেছি মুনাফিকরা আসলে বিশ্বাস করে না, শুধু “ভান ধরে”, কিন্তু এখানে আল্লাহ স্পষ্ট বলছেন, “তারা আল্লাহকে (বিশ্বাস করেই) স্মরণ করে, কিন্তু খুব কম”! তারা নামাজও পড়ে!
আমাদের মধ্যে কয়জন বুকে হাত দিয়ে বলতে পারব, “বুকের ভিতরের খুঁচখুঁচে অনুভূতিটাই পাপ” হাদীসটা মেনে চলতে পারি, কয়জন বলতে পারব, আমি আল্লাহকে স্মরণ করি, অনেক বেশি?
আমাদের কাফির হওয়ার রিস্ক নেই হয়তো, কিন্তু নিজের ভিতরে আর চারিদিকে তাকালে মুনাফিকের বৈশিষ্ট্যগুলো দেখতে পাই অনেক বেশি! তাই আমি নিজে অন্তত অন্য কাউকেই নরকবাসী বলে ভাবতে পারি না...
অথচ, অথচ, সমাজে এই “আমি মুসলিম তাই বেহেস্তের টিকেটওয়ালা” কিংবা, “আমি ভালো মুসলিম ও খারাপ মুসলিম” টাইপের বিশ্বাসগুলো কি রকম ক্ষতের মত দগদগে হয়ে আছে... মানুষ এই গেড়ে থাকা বিশ্বাস থেকে ঘৃনা করে চলছে, ডিস্ক্রিমিনেইট করে চলছে, বিবাদ করে চলছে। ব্যাখ্যাগুলো টানতে টানতে ইলাস্টিসিটি ছুটিয়ে ফেলছে।
ইসলাম আর নারী... কি ভীষণ সেনসিটিভ একটা টপিক... কিন্তু এই নিয়ে যত ক্যাচাল তার জন্য আমরা ছাড়া আর কে দায়ী? আমরা কুরআনকে ব্যবহার করছি, সে জন্যই তো! প্রতিটা মুসলিম পুরুষ জানে একাধিক বিয়ে করা এবং বউকে কিছু শাসন করা স্বামী হিসেবে তার অধিকার, কিন্তু কয়জন মুসলিম পুরুষ জানে রাসুল তাঁর সারা জীবনে কোন নারীর গায়ে হাত তুলেন নি? প্রতিটা মুসলিম এই মিথ্যা হাদীসটা জানে: "স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেস্ত", কিন্তু কয়জন এই সত্য হাদীসটা জানে: “তোমাদের মধ্যে সেই সবচেয়ে ভালো যে তার স্ত্রীদের কাছে ভালো” (সহীহ মুসলিম)?
আমরা ইসলামের ঠিক ততটুকু মনে রাখি, যতটুকু আমাদের কাজে লাগে!
আমরা লেকচারের পর লেকচার শুনে যেতে পারি, বিশাল তাত্ত্বিক জ্ঞানী হয়ে যেতে পারি, তর্কাতর্কিতে ভার্চুয়াল যুদ্ধ করে জিহাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে পারি, “ইসলাম বিদ্বেষীদের ষড়যন্ত্র” আখ্যা দিয়ে অনেক কিছুর প্রতি অন্ধ হয়ে থাকতে পারি। কিন্তু এতে কিছুই হবে না! আমাদের এখন শুধু দরকার নিজেদের সাথে “সৎ” হওয়া। যা করি না তা বলা থেকে দূরে থাকা (সূরা সফ: ২)।
যা জানি তা সাথে সাথেই মানা শুরু করা। ফাঁক ফোঁকড় না খুঁজে, ইসলামের ব্যাখ্যাকে টানতে টানতে নিজের প্রবৃত্তির দাসত্বের জন্য জাস্টিফিকেশন না খুঁজে শুধু মনে রাখা, “যা করতে মনে খচখচে লাগে, তাই পাপ”।
এই কাজটা আমাদের সমাজ করিয়ে দিবে না, কোন ইসলামী সংগঠন করিয়ে দিবে না। প্রতিটা মানুষ জেনে বুঝে কোন পাপ করছে কি না, সেটা আল্লাহ আলাদা আলাদা করে বিচার করবেন, সে জন্য নিজে পাপ বুঝেও মনকে প্রবোধ দিয়ে যখন কিছু করে যাই, তার দায় আল্লাহ 'অন্য' কাউকে দিবেন না। এই যুদ্ধটা প্রত্যেকটা মানুষের জন্য, আলাদা আলাদা ভাবে, একেবারে নিজের মত করে। যতদিন আমাদের বেশির ভাগ মানুষ এতটুকু করতে পারছি না, ততদিন যত থিওরীই কপচানো হোক, কিছুতেই কিছুই হবে না। কারণ, "যেই কথা হৃদয় থেকে আসে, তা হৃদয়কে স্পর্শ করে। আর যা জিহ্বা থেকে আসে, তা শুধু কান পর্যন্ত পৌঁছে।" [হাবিব ওমর]
0 মন্তব্য:
Post a Comment