হজ গ্রুপ খুঁজতে নিয়ে মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। প্রচুর হজ গ্রুপ, একেক গ্রুপের স্পেশালিটি একেক রকম, কাদের সাথে যাবো? সাথে পুঁজি হিসেবে ছিল ইসমাইল ডেভিডস আর ভাইয়ার সাবধানতা: সাথী ভালো না হলে সেই খারাপ লাগাটা হজকেও স্পর্শ করে। ভয় পেতাম রিমার কথা ভেবে, যদি হজের মাঝখানে আমার সত্যি সত্যি মনে হওয়া শুরু হয় কখন বাসায় যাব!
হজগ্রুপগুলো তাদের ভিন্ন ভিন্ন স্পেশালিটির জন্যই বিশেষ কিছু ধরণের মানুষকে আকৃষ্ট করে। কেউ হয়তো ভাষাভিত্তিক দল নিয়ে যায়, আরবি ভাষী, বাংলাভাষী, উর্দুভাষী, তাতে যারা দ্বিতীয় কোন ভাষায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না, তারা খুব আরাম পায়। কেউ ইসলামের বিশেষ কোন মতের বিশেষ বিশ্বাসী, সালাফী, ইসলামী আন্দোলন বা দেওবন্দী, তারা সমমনা মানুষ পায়। আমাদের জন্য সেরকম শক্ত পছন্দ করার মত কোন হজগ্রুপ ছিল না, সেজন্যই সিদ্ধান্ত নিতে ঝামেলা হলো।
শেষ মেষ লাব্বাইকের সাথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম কয়েকটা কারণে:
১. খরচ—সিডনীর সস্তা গ্রুপগুলোর মধ্যে অন্যতম।
২. পাঁচশ হাজীর বিশাল বড় গ্রুপ, অন্তত: পাঁচ বছর ধরে সিডনী থেকে হাজীদের হজে নিয়ে যাচ্ছে। কারো থেকে খারাপ কিছু শুনি নি। অনেক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বলে মিসম্যানেজমেন্ট কম। এত বড় গ্রুপ নিয়ে যাচ্ছে বলে নিশ্চয় ডিসকাউন্ট পায়, তাই দাম অনুযায়ী বেশ ভালো সার্ভিস দিতে পারে।
৩. দিন-তারিখ আমাদের খুব ভালো ছিল। অনেক হজ গ্রুপ চল্লিশ দিনের জন্য নিয়ে যায়, কেউ বিশ দিনের জন্য নিয়ে যায়। আমাদের হজ গ্রুপটা ঠিক আঠাশ দিনের জন্য নিচ্ছিল। আমি চার সপ্তাহের বেশি ছুটি নিতে পারতাম না।
৫. হজ গ্রুপ নিয়ে যাওয়া তিনজন শেইখ সম্পর্কেই ভালো কথা শুনেছি অনেক। তিনজন ভিন্ন ভিন্ন দেশের। এত বড় গ্রুপ তাই হাজীদের মধ্যেও বিভিন্ন দেশী মানুষদের মিশ্রন হয়। ফলে ইংরেজি মূল ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
৬. দুরত্ব: মক্কার হোটেলটা থেকে মসজিদুল হারাম পনের মিনিটের হাঁটা, মদীনার হোটেল যদিও তিন তারা, কিন্তু রাস্তা পার হলেই মসজিদ।
৭. একই খরচে ভালো কিছু অপশন সহ একটা গ্রুপ হিলটন হোটেলে রাখার প্রতিজ্ঞা করছিল, কিন্তু সেখানে প্রতিটা রুমে ৬-৭ জন থাকবে! এত মানুষ এক সাথে থাকতে হলে একেকজনের একেক রুটিন, মতপার্থক্যের চিপায় পড়ে অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে। লাব্বাইক সর্বোচ্চ চারজনকে এক রুমে রাখে, তাতে সঙ্গীদের সাথে মত না মিললেও খুব বেশি ঝামেলা হওয়ার কথা না।
৮. বড় গ্রুপ বলে আসলে স্বাধীনতা প্রচুর। আগেই জানতাম, হজের দিনগুলো হজের মূল জিনিসগুলোতে ওরা সাহায্য করবে, কিন্তু তাছাড়া বেশির ভাগ জিনিসই নিজেদের সময় অনুযায়ী করতে হবে। তাতে হয়তো বয়স্ক মানুষদের বেশ সমস্যা হয়ে যেত, কিন্তু আমি আর নও, দুজনেই নিজেদের মত করে অভিজ্ঞতা পেতে পছন্দ করি, তাই এই ব্যাপারটা আমাদের পছন্দ হয়েছিল।
সিদ্ধান্তটা ভুল হয় নি একেবারেই, লাব্বাইক হজগ্রুপের ব্যাপারে আমার সত্যিই বিন্দুমাত্র অনুযোগ নেই, কি করে এত বিশাল একটা গ্রুপকে এত সুশৃঙ্খল ভাবে হজ করালেন, সেটা ভেবে আমি সঅবাক হই। একেবারে সত্যি সত্যি দোআ করতে ইচ্ছা হয় ওঁদের জন্য।
মক্কায় যাওয়ার আগে আমি গুগল ম্যাপে আমাদের হোটেল থেকে কাবার পথটুকু দেখে নিয়েছিলাম। ব্যাপারটা আমাদের খুবই কাজে লেগেছে! যদিও ওখানে গেলে সব এমনিতেই চেনা হয়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু এত মানুষের মধ্যে কনফিউশন কমানোর যদি পথ থাকে, তাহলে ক্ষতি কি?
সেটার কথা ভেবেই একটা ফটোশপ করে গুগলের ম্যাপে কিছু ট্যাগ বসালাম। পাঠকদের কতটুকু কাজে লাগবে জানি না, এই কাজটা করতে আমার ভালো লেগেছে, কারণ পুরা এলাকার একটা রিভিশন হয়ে গিয়েছে, আর পরে যদি কখনও যাই, তাহলে ইনশাআল্লাহ কাজে লাগবে।

মসজিদুল হারামে অনেকগুলো গেই, আশিটার মত হবে। চল্লিশ লাখ মানুষের ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন এই মসজিদে ঢুকার সময় কিছু ল্যান্ডমার্ক দরকার হয়, না হলে আর বের হতে হবে না!
আমি পাঁচ নম্বর গেইট/আজওয়াদ গেইট দিয়েই বেশির ভাগ সময়ে ঢুকতাম। বের হওয়ার সময়ও এদিক দিয়ে বের হতাম। আলাদা নামাজ পড়লে আমার আর নওয়ের মিলনস্থল থাকতো আজওয়াদ গেইটের সামনের ল্যাম্প পোস্টটা। ওখানে অবশ্যই আরও অনেকেরও মিলনস্থল থাকতো। কিন্তু সেখান থেকে খুঁজে পেতে সমস্যা হতো না। এক সাথে হোটেলে ফিরার ইচ্ছা থাকলে মসজিদের ভিতরে দেখা করতে চাওয়া বোকামি!
আজওয়াদ গেইটের কাছে দোতালা এবং তিন তালায় যাওয়ার জন্য সিঁড়ি, এলিভেটর এবং লিফট, তিনটাই আছে। কখনও নিচতালা ভরে গেলে চট করে দোতালা, কিংবা তারও উপরে উঠে যাওয়া যেত খুব সহজে। কখনও কখনও আবার একেবারে চারতালায় উঠে যেতাম! এমনিতে, মসজিদটা দোতালা, তাই তিনতালা মানেই ছাদ, কিন্তু সাফা আর মারওয়ার মাঝখানেরটুকুতে ভিড় এড়াতে ২০১১ তেই তৃতীয়তলা বানানো হয়েছে, ফলে শুধু ডান দিকে, সাফা মারওয়ার অংশটুকুতে ছাদটা চারতলায়। মানুষ হয় সেই চারতলা ছাদের কথা জানে না বা কোন কারণে সেই ছাদে যায় না, কারণ হজের ঠিক আগে পরে, হারাম যখন ভিড়ে টই টুম্বুর, তখনও দেখেছি সেই চতুর্থ তলার ছাদে মানুষ খুব কম!
আরেকটা জায়গায় একেবারে নামাজের পনের মিনিট আগে গিয়েও সব সময় জায়গা পেতাম, ম্যাপের বাঁ দিকে, “নতুন এসি এলাকার” দোতালায়। এমনিতে মসজিদুল হারাম পুরাটা এয়ারকন্ডিশনড না, কিন্তু এই অংশটা নতুন করা, তাই এসি আছে। এখানে নামাজ পড়তে হলে কাবা থেকে বেশ দূরে যেতে হয়, কাবা দেখা যায় না, সেজন্যই হয়তো জায়গাটার আকর্ষন কম। কিন্তু সত্যি বলতে কি, মাঝে মাঝে দুপুর বেলা প্রচন্ড রোদ থেকে এসে এয়ারকন্ডিশনড অংশটায় ঠান্ডা টাইলসে কপাল ঠেকিয়ে ঠেলা ধাক্কা ছাড়া নামাজ পড়তে এত শান্তি লাগত! আর “জায়গা পেতাম” বলতে কিন্তু আরামে বসার জায়গার কথা বলছি না, জমজম পানির কন্টেইনারগুলোর বা দেয়ালের আশ পাশ দিয়ে মানুষ একটু জায়গা রেখে বসতো, সেসব জায়গার কথা বলছি। শুকনা মানুষ বলে অল্প জায়গাতেই নিজেকে বসিয়ে ফেলতে পারতাম। নামাজের পনের মিনিট আগে অন্য জায়গায় সেরকম জায়গাটুকুও পাওয়া যায় না।
মসজিদের বেইজমেন্টে অবশ্য যে কোন সময়ে জায়গা পাওয়া যেত, কিন্তু ওখানে নামাজ পড়তে আমার এত বিরক্ত লাগত! প্রচন্ড গরম!
আজওয়াদ গেইটের কাছেই আজওয়াদ রাস্তা ছিল। সেই রাস্তা ধরে একটু এগুলোই হাতের ডান দিকে ছিল আমাদের হোটেল। ভিড় না থাকলে হাঁটতে দশ/পনের মিনিট লাগত, কিন্তু হজের আগে দিয়ে সেটা আধা ঘন্টায় গিয়ে পৌঁছাতো!
0 মন্তব্য:
Post a Comment