মক্কা, মদীনা দুটো শহরেই, হোটেল থেকে আমাদের সকালের নাস্তা দিত। বুফে খাবার, এশিয়ান, আরব, পশ্চিমা, সব ধরণের নাস্তাই থাকতো, বেশ আয়েশ করে পেট ভরে খেতাম আলহামদুলিল্লাহ। দুপুর আর রাতের খাবার ছিল আমাদের নিজেদের দায়িত্বে। হারাম থেকে বের হলে রাস্তার দুদিকেই প্রচুর খাবারের দোকান। একই শহরে যেখানে ২০-৩০ লাখ মানুষ এসে যায়, সেখানে স্বভাবতই দোকানে বসে খাওয়ার সুযোগ কম, খাবার হাতে নিয়ে হয় হারামের বাইরের চত্ত্বরে না হয় রাস্তার ফুটপাথে বসে খেতে হতো। সেভাবেই খেতে খেতে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই খেয়াল করলাম, রাস্তায় চিকেন আর মুরগী ছাড়া আর কিছু পাওয়া ভার! হয় মুরগী-পোলাও, মুরগী-রুটি, ঝোলওয়ালা মুরগী, আগুনে পোড়ানো মুরগী, চিকেন শর্মা, চিকেন বার্গার...
এগুলোর বাইরে আছে খাসী আর গরুর গোশত! খাসী গরুর চেয়ে মুরগীটা আমার বেশি পছন্দ, কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই দুইবেলা চিকেন আর মুরগী ছাড়া কিছু না পেয়ে আমি রীতিমত হাঁপিয়ে উঠলাম! একে তো গোশত গোশত গোশত, তার উপর এত তেল আর মশলা! মক্কা, মদীনা, দুটো শহরের এক শহরেও আমি তেলছাড়া সাদা ভাত পেলাম না! সৌদিতে নিশ্চয়ই সাদা
ভাত খায় না! তখনই প্রথম টের পেলাম, আমার স্বাস্থ্য সচেতন মা আমাদের টেস্ট বাডকে চিরতরে বদলে দিয়েছেন! একটু
খানি সবজি, একটু খানি মাছের জন্য কেমন যে লাগত! তেল ছাড়া, মশলা ছাড়া, শুধু সবজি। বেশি করে লেবু চিবে লেবুর খোসাসহ একটু ডাল খেতে পারলে কি শান্তি লাগত! সিডনীতে ফিরে কয়েকদিন শুধু লেবু দিয়ে ডাল ভাত খেয়েছি আর প্রথম সুযোগেই সুশি খেয়েছি, তেল-মশলাহীন সুশি! আর ফল? ফল বলতে পাওয়া যেত খেঁজুর আর না হয় খুব শুকনা এক হালি কমলা, আপেল, একটা দু'টা দাগওয়ালা কলা। দাম ছিল ভয়াবহ বেশি। মরুভূমির দেশ, খাবারের মেন্যুই তাই পুরাপুরি অন্যরকম। আস্তে আস্তে আমরা দুটো খাবার আবিষ্কার করলাম। প্রথমটা হচ্ছে, “মক্কা টাওয়ারের” (১১ নম্বর পোস্ট দ্রষ্টব্য... ওই যে, বড়, সবুজ, কুৎসিত ঘড়িওয়ালা বিল্ডিংটা, যা কিনা ইসলামিক গ্রীনিচ :(!) নিচে, “আস সাফা শপিং সেন্টারের” ফুড কোর্টের মালয় দোকানটা! ওখানে সাদা ভাত আর পালং শাকের ঝোল পাওয়া যেত, খুব কম মশলা দিয়ে পাতলা করে রান্না করা পালং শাকের ঝোল। খেয়ে এত তৃপ্তি হতো! আর দুই নম্বর হচ্ছে, লাবান আর চিড়া! লাবান অর্থ্যাৎ দই।

ছবির ঠিক এই ব্র্যান্ডের লাবান পাওয়া যেত প্রায় প্রতিটা দোকানেই। অসম্ভব মজা। একটুখানি লবন মিশিয়ে নিলে আরও মজা হয় (লবন পেতে অনেক ঝামেলা করতে হয়েছে, দোকানে দোকানে ঘুরতে হয়েছে, তাই যাদের লবন কমে সমস্যা হয়, তাদের সামান্য লবন নিয়ে যাওয়া ভালো...)। আর চিড়া ঘটনা হচ্ছে, আমরা হজে যাচ্ছি বলে আম্মু, আমার শ্বাশুড়ি, ঢাকা থেকে কাকে কাকে ধরে অনেকগুলো চিড়া পাঠিয়ে দিয়েছেন, যদি আর কোন খাবার না পাই তাহলে অন্তত: চিড়া চিবিয়ে যেন বেঁচে থাকতে পারি। প্রথমে আমরা দুজনেই হেসে ফেলেছিলাম, কিন্তু যখন মুরগী নিয়ে সিরিয়াস বিরক্ত, তখন একদিন চিড়া ভিজিয়ে লাবান আর লবন দিয়ে খেয়ে কি যে শান্তি লাগল! আস্তে আস্তে সেখানে ভ্যারাইটি যোগ হলো, একটা কলা কিংবা কয়েকটা খেঁজুর! একজন ডায়বেটিকস রুগীর সাথে পরিচিত হওয়ার পরে ওনাকে চিড়াগুলো দিয়ে দিলাম, বেচারার চিড়া শেষ হয়ে যাওয়ায় খুব কষ্টে ছিলেন। তখন এক রিয়ালের নরম বনরুটি আবিষ্কার করলাম, তেল মশলা থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে ওই বান, কলা আর লাবান আমরা খুব মজা করে খেতাম! মাত্র দুই রিয়েলে অসম্ভব তৃপ্তিদায়ক খাবার!
মদীনায় যাওয়ার পরে আবার মালয়শিয়ান দোকানটা মিস করছিলাম! তখন একটা আরব দোকানে গিয়ে সবজি খুঁজতে খুঁজতে লিস্টে একটা সবজি-তরকারি পেয়ে দোকানওয়ালাকে দিতে বললাম। দোকানওয়ালা বাঙালী ছিলেন, ওই তরকারি উনি দিতে চান না। আমরা নাকি খেতে পারব না! জোর করে দিতে বললাম, উনি মাথা নাড়তে নাড়তে দিলেন। খেয়ে মনে হলো ভাগ্যিশ নিয়েছিলাম! ঝোলওয়ালা ঢেড়শের তরকারী, রুটি দিয়ে ভিজিয়ে খেতে বেশ লাগল, মুরগীর চেয়ে হাজার গুণ ভালো! এই তরকারিটা মোটামোটি সব আরব দোকানেই পাওয়া যায়।
মক্কায় শুনেছি “মিসফালায়” প্রচুর বাঙালী খাবারের দোকান। কিন্তু সব সময় নামাজের পরে ওই দিকটায় অনেক ভিড় থাকতো। এত ভিড় ঠেলে খেয়ে আসতে যেই সময় আর এনার্জি লাগত, সেটাকে গ্রহনযোগ্য মনে হয় নি! তবে মদীনায় একবারই প্রায় আধা ঘন্টা হেঁটে খেয়ে এসেছিলাম বাঙালী দোকানে, একজন বাঙালী ভাই খাইয়েছিলেন খুব যত্ন করে। রুই মাছটা ভালো লেগেছিল, ডাল খেলাম শখ করে, কিন্তু ততদিনে আসলে মশলা আর তেলে খুব বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলাম, আর হোটেলের খাবারে যা হয়, প্রচুর তেল আর মশলা!
আর আল বাইকের কথা তো বলতেই হবে। আল বাইক ম্যাকডোনালডস আর কেএফসির মত, ফাস্ট ফুডের দোকান, কিন্তু সৌদির নিজেস্ব ব্র্যান্ড বলে বেশ সস্তা। এগারো রিয়েলে আমাদের দুজনের ভরপেটে খাওয়া হয়ে যেত, খাবারগুলো বেশ মজাও ছিল। কিন্তু ওই পুরানো সমস্যা, আল বাইকে যেতে অনেক হাঁটতে হতো, মক্কা মদীনায় ঘুরতে গেলে এক কথা, কিন্তু উদ্দেশ্যই যখন যতটা সম্ভব মসজিদে সময় কাটানো, তাই দু'বারের বেশি খাই নি ওখানে।
আমাদের সাথে মা কিছু শুকনা বাদাম আর কিসমিস এক সাথে মিশিয়ে দিয়েছিল। এটা সব সময় ব্যাগে রাখতাম। হঠাৎ খিদা লেগে গেলে একটু কিসমিস বাদাম খেয়ে জমজম খেয়ে নিলেই আবার শরীরে আর মনে বল ফিরে আসত! মাঝে মাঝে আশে পাশের মানুষদের দিলেও অনেকে খুব খুশি হতো, হয়তো খিদে পেয়েছে, কিন্তু জায়গা ছেড়ে বের হতে চাচ্ছে না। এই ব্যাপারটা আমার খুব ভালো লাগত। পশ্চিমে বড় পারসোনাল স্পেইসের কারণে মানুষকে নিজের হাতের মুঠোয় ধরে বাদাম আর কিসমিস সাধা যায় না বা পাশের অচেনা বুড়িটার হাতটা টেনে নিয়ে তাতে কিছু বাদাম গুঁজে দিলে লাজুক লাজুক সুন্দর হাসিটা দেখতে পাওয়া যায় না! এটা আমি করতে পারতাম না তেমন, কি না কি ভাবে ভেবে অনেক সময় তটস্ত থাকতাম, কিন্তু নও কি অবলীলায় বিতরন করে বুড়ি বুড়ি মহিলাগুলোর মুখে ফোকলা হাসি ফুটিয়ে যেত!
মাঝে মাঝে (সর্বমোট তিন/চার দিন হয়েছে হয়তো) দিনের শেষে পা বেশ ভালোই ব্যাথা করতো। তখন রুমে
ফিরে, হট শাওয়ার নিয়ে, পেশীর ব্যাথার জন্য কেমিস্ট থেকে প্রেসক্রিপশন ছাড়া কিনতে পাওয়া যায় এমন জেল লাগিয়ে শুয়ে পড়তাম। চার ঘন্টার ঘুমেই ব্যাথা আর ক্লান্তির লেশ মাত্র থাকত না।
কিসমিস বাদাম, এক বোতল পানি আর নিজের স্যান্ডেল রাখার জন্য সাথে ছোট্ট একটা ব্যাগ রাখতাম সব সময়। স্যান্ডেল হয়তো চুরি হয় না, কিন্তু ওই যে, লাখ লাখ মানুষ বলে কথা! কাবা কর্তৃপক্ষ নিজেই টাঙিয়ে দিয়েছেন নিচের নোটিশ:

ক্যামেরার ব্যাপারে এক সময় খুব রেস্ট্রিকশন ছিল, এখন আস্তে আস্তে বেশ শিথিল হয়ে এসেছে। শেইখ উথাইমিনের (যারা জানেন না তাদের জন্য: শেখ উথাইমিন সালাফী স্কলার, সৌদি কর্তৃপক্ষ মূলত সালাফী) মতে ক্যামেরায় ছবি তোলা আয়নায় নিজের চেহারা দেখার মতই, আঁকা ছবির চেয়ে আলাদা। সে জন্যই হয়তো। তবে ক্যামেরার সাইজ বেশি বড় হলে অবশ্য ঝামেলা হবে! তবে ক্যামেরা নিলে আবার অন্য রকম বিপদ হতে পারে...
উইটিউবে এরকম অনেক ভিডিও... পাবলিক তাওয়াফ করতে করতে ভিডিও করেছে! তাওয়াফের মধ্যে এমন করার অনুমতি আছে কিনা আমার জানা নেই, কিন্তু এই অবস্থায় তো মন লাগাতে পারার কথা না!
ঢুকার সময় ব্যাগ সার্চ হয় এবং ব্যাগ বেশি বড় হলে ভিতরে নেয়া যায় না, নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য। তাতে কি আর মানুষ ঠেকে? বিশ তিরিশ লাখ মানুষের মধ্যেও নিজের ব্যাগ খুঁজে পাওয়ার অভিনব ব্যবস্থা আবিষ্কার করেছে পাবলিক:



1 মন্তব্য:
তোমার এই সিরিজের সবক'টি লেখা একসাথে পড়লাম। এককথায় আমি বাকশূণ্য।
Post a Comment