Friday, November 11, 2011

আমি “সতীত্ব বাঁচাতে” হিজাব পরি না

নিজের ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য আমি হিজাব পরি না। ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য আমি মার্শাল আর্টস ক্লাস করেছি। ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য আমি কোন সময়ে এবং কোন জায়গায় গেলে বিপদে পরতে পারি তা বুঝে শুনে সেই সময়ে সেই জায়গাগুলো এড়িয়ে চলি।

আমি মাছি তাড়াতে হিজাব পরি না, কারণ জানি ইসলামে ’সস্তা’, ’সতীত্ব’ বলে কোন ’অ্যাবসুলুট কনসেপ্ট’ নেই। আগে দুই বার বিবাহিতা নারী খাদীজাকে নিয়েও তাই ইসলামের নবী মুহাম্মদ সুখী ছিলেন, পুরা যৌবনটুকুই কাটিয়ে দিয়েছিলেন এমন এক নারীকে নিয়ে, যিনি আগে একজন নয়, বরং দুই জন পুরুষের আটপৌরে স্ত্রী ছিলেন। যারা নারীদের মুক্তার মত দেখতে চায়, চির-অস্পর্শিত, চির-অদর্শিত, তাদের কাছে খাদীজা মূল্যহীন, সস্তা, সেই খাদীজা, যিনি মুহাম্মদ (সা) কে পুরা যৌবনে (পঁচিশ থেকে পঞ্চাশ) সুখী রেখেছিলেন, মৃত্যুর পরেও বার বার চলে আসতেন তাঁর আলোচনায়। আমি জানি ইসলামে অতীতকে বদলে ফেলা যায় বর্তমান দিয়ে, সে জন্যই ’সতীত্ব’ আর দামী হওয়ার কোন অ্যাবসুলুট কনসেপ্ট নেই ইসলামে।

আমি মনে করি একটা মেয়ে যত খোলাখোলি ভাবেই চলুক, তার উপর আক্রমন করা পুরুষটার দোষ পুরুষটারই। আমি কৃতজ্ঞ যে আমার জীবনের পুরুষেরা, আমার স্বামী, ভাই, বাবাও তাই মনে করে। যদি কখনও কোন ছেলের মা হই, তাহলে আশা করি সেও এভাবে ভাবতে শিখবে। মিশরে তাহরীর স্কয়ারে যখন পশ্চিমা নিউজ রিপোর্টার লারা লোগানের উপর হায়েনার মত ঝাপিয়ে পড়েছিল আশে পাশের পুরুষেরা, সবার সামনেই ধর্ষণ করছিল ওকে, তাদের দোহাই তো ছিল এটাই, মেয়েটাই তো ওর টাইট জিন্স দিয়ে উদ্বুদ্ধ করছে! ও তো চাচ্ছিল! আমি, আর আমার জীবনের পুরুষরা থাকতে চাই সেই ’কালো বোরখা’ পরা মেয়েদের আর তার পুরুষ সাথীদের মধ্যে যারা লারা লোগানকে বের করে এনেছিল হায়েনাদের থেকে। আমি যেভাবে ইসলাম শিখেছি, তাতে আমি জানি, লোভ চারিদিকে থাকবেই, একে বলা হয় ’পরীক্ষা’। আর পরীক্ষায় পাশ করার দায়িত্ব এক একজন ব্যক্তির, যার মাধ্যমে সে পরীক্ষায় পড়ছে সে না। যে ’পরীক্ষা’ তার হিসাব সম্পূর্ণ আলাদা। স্বয়ং শয়তানকে দোষ দিয়েও পার পাবে না আখিরাতে কেউ!

হিজাবের জন্য বহুল ব্যবহৃত কিছু যুক্তি এগুলো:-

“- কলা আল্লাহ প্যাকেট করে দিয়েছেন, চকলেটও ফ্যাক্টরি থেকে প্যাকেট হয়েই বের হয়, কিন্তু তাদের চেয়েও অমূল্য যে নারী, তাকে কীভাবে প্যাকেট না করার কথা ভাবি?

- যারা হিজাব করে না, তারা তো ইভটিজিং এর শিকার হবেই!

- একজন মেয়ে যদি নিজেকে সামলিয়ে চলতে না পারে, পুরুষকে প্রলুব্ধ করে, ঐ দুর্বল-কাতর মুমিন যদি নিজেকে সামলাতে না পারে - তাহলে কি সব দোষ ঐ পুরুষের? টাইট জিন্স আর ফতুয়া পড়া মেয়েটার কোনো দোষ নাই

- বোরখা না পরলে সমাজে অসামাজিক কার্যকলাপ বেড়ে যাবে।

- বোরখা একটি প্রতিরক্ষা বর্ম।“

কিন্তু এর একটা কারণেও আমি হিজাব পরি না।

আমি হিজাব পরি, কারণ আমি আল্লাহতে বিশ্বাস করি, আর আমি জানি হিজাব আল্লাহর নির্দেশ। আল্লাহর নির্দেশ আমি খুঁজে পাই কুরআন আর হাদীসে, কুরআনে সন্দিহান আর হাদীসে অবিশ্বাসকারী লেখকদের লেখায় না।

কুরআন হাদীসে আমি ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য কখনও হিজাবের ব্যবহার শুনি নি, বরং পেয়েছি শুধু হিজাব নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না!!! আয়েশার ব্যাপারে গুজব রটেছিল তিনি যখন নিকাবে মুখ ঢাকতেন তখন! হিজাব এবং নিকাব বিশুদ্ধতম নারীদের একজন, আয়েশাকেও ’সুরক্ষিত’ রাখতে পারে নি।


উমরের যুগে এক অবিবাহিতা মেয়ে যখন গর্ভবতী হয়ে পড়েছিল (সূত্র: ইবন কুদামাহ)তখন সে নিজেরআত্মপক্ষ সমর্থন করেছিল এভাবে: আমি গভীর ঘুমে ঘুমিয়ে ছিলাম, কে যে এসে কখন কি করেছে, আমি কিছুই টের পাই নি। উমর মেয়েটাকে নিরপরাধ ঘোষনা করে ছেড়ে দিয়েছিলেন। চোদ্দশ বছর পরে বাংলাদেশের সেক্যুলার আইনজীবিরাও এমন কথা বলা কোন মেয়েকে ’ধর্ষিতা’ অর্থ্যাৎ নির্যাতিতা ঘোষনা করবেন এক কথায়, তা আমি বিশ্বাস করি না! কারণ আমাদের যুগে, পশ্চিমে এবং প্রাচ্যে, ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায় পুরাপুরিই মেয়েদের, ছেলেদের না!

ইসলামে যে হিজাব ’ব্যক্তিগত সুরক্ষার’ নিশ্চিত করার জন্য না সেটা বুঝা যায় আমাদের নামাজের পোশাক দেখে। একান্তই নিজের ঘরে একাকী নামাজ পড়ার সময় শুধু আল্লাহর উপস্থিতি, ধর্ষক “পুরুষদের” অনুপস্থিতিতেও মাথা ঢেকে, গায়ে ঢিলা জামা গলিয়ে নামাজ পড়তে হয়! এর ব্যাখ্যা কি চকলেটের চোকলা লজিক দিয়ে করা যাবে?

আমার কাছে কলার চোকলা, চকলেটের খোসা, খোলা খাবার আর ঢাকা খাবার, এসব উদাহরণ বিচ্ছিরি এবং অশ্লীল লাগে। যারা হিজাবের সপক্ষে এই সব যুক্তি দেয়, তাদের উর্বর মস্তিষ্ক খাটাতে বন্ধ করতে দোহাই দেই। এমন উদাহরণ কি কুরআনে আছে? হাদীসে আছে? কিন্তু হাদীসে আর কি আছে আপনাদের শোনাই, হাদীসে আছে, আমাদের নবী মুহাম্মদ সাধারনত কারও সামনে বুকের জামা সরাতেন না, স্কলাররা বলেন, তিনি মাথাও ঢেকে রাখতেন বেশির ভাগ সময়ে। রাসুল আরও বলেছেন, ’লজ্জা ঈমানের অর্ধেক (বুখারী)’ (নারীর ভূষণ না!)। খোলা খাবারের উদাহরণ দিয়ে আমরা নারীকূলও তাহলে পুরুষদের দোহাই দেয়া শুরু করি, রোমশ বুক ঢেকে রাখুন প্লীজ, মাথা ঢেকে রাখুন দোহাই লাগে, খোসা ছাড়া কলায় আকর্ষন কমে যায়, মাছি বসে! হাজার হোক, হাদীসের কনসেপচুয়াল ব্যাক আপ তো আছেই আমাদের... (এটা আমার কাছে আশ্চর্য লাগে, পুরুষদের জন্য ঢিলা পোশাক, মাথায় টুপি, ধর্মীয় নিদর্শন ধরে নেওয়া হলেও নারীদের ক্ষেত্রে কেন এই কলার খোসার কনসেপ্ট চালু করার দরকার হলো!)

শুকর না খাওয়ার অনেক পার্থিব গুণ থাকতেই পারে, কিন্তু আমার কাছে হালাল খাবার খাওয়ার জন্য সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ না। আমার জন্য শুধু এতটুকু জানাই যথেষ্ট যে এটা আল্লাহর নির্দেশ। তবে আমি এও জানি যে আল্লাহর নির্দেশের পার্থিব গুণ থাকে সাধারণত! কিন্তু সেই পার্থিব গুণগুলো আমার জন্য নির্দেশ পালনের ’মূল কারণ’ না। পার্থিব গুণগুলো শুনে হয়তো খুশি হই, আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি, কিন্তু এতটুকুই! মদ নিষেধ করার সময় আল্লাহ বলেছেন, “তারা তোমাকে জিজ্ঞেস করছেঃ মদ ও জুয়ার ব্যাপারে নির্দেশ কি? বলে দাওঃ ঐ দুটির মধ্যে বিরাট ক্ষতিকর বিষয় রয়েছে যদিও লোকদের জন্য তাতে কিছুটা উপকারিতাও আছে, কিন্তু তাদের উপকারিতার চেয়ে ক্ষতি অনেক বেশী” (২:২১৯)

আল্লাহ নিজে স্বীকার করছেন মদ আর জুয়ায় ’উপকারিতা’ আছে, কিন্তু তারপরেও সেগুলো ’হারাম’! আমরা যারা আল্লাহতে বিশ্বাস করি, তাদের এই বিশ্বাস জন্মানো উচিত যে উপকারিতা আর ক্ষতির হিসাব আল্লাহই সবচেয়ে ভালো করতে পারবেন। যারা বলতে চান ’হিজাব নারীমুক্তির একমাত্র গ্যারান্টি’, ’হিজাব পড়লে সমাজে শান্তি বজায় থাকবে’, ’হিজাব পড়লে নারী মুক্তার মত ঝকঝকে থাকবে’, তাদের এই কথাগুলো কেউ যদি নিজের ব্যক্তিগত জীবনে ভুল প্রমান করতে পারে, তাহলে কি হিজাব তাদের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যাবে? তা তো না! যত যা কিছুই হোক, এখানে তো আমাদের জন্য ’তালগাছ আল্লাহর’, যত পার্থিব যুক্তিই হোক, সেসবের উর্ধ্বে কেবল আল্লাহর নির্দেশ! তাহলে প্রথমেই সে কথা বলো না রে বাপু!

হিজাব হয়তো আমাকে পার্থিব কিছু সুবিধা দেয়, সে অস্ট্রেলিয়ার তীক্ষ্ম রোদ থেকে রক্ষাই হোক, মানুষের চোখে সম্মানিত থাকাই হোক। হিজাব আমাকে কিছু পার্থিব অসুবিধাও দেয়, প্রচন্ড গরমে হিজাব পড়াটা খুব স্বস্তিকর না, মানুষের মনে হিজাব সম্পর্কে অনেক অনেক প্রেজুডিস, বাংলাদেশে ’মোল্লা’ আর এখানে ’ফান্ডামেন্টালিস্ট’। কিন্তু আমি তো ’লাভ ক্ষতির’ হিসাব পার্থিব হিসাবে করছি না। আমার হিসাব এতটুকুই, হিজাব আল্লাহর নির্দেশ। বাড়তি যা কিছু পাই, তা আমার অতিরিক্ত পাওনা।

6 মন্তব্য:

মুনিয়া said...

অনেকদিন পর তোমার লেখা পড়লাম। খুব ভাল লাগল... আর অনেক বেশি অ্যানালিটিক্যাল কমেন্ট না করে বলি- মন ভাল করে দিল লেখাটা। কেন যেনো..

WAhid Dilawar Al-Hakim said...

ভালো লাগলো।
প্রতিটি কাজই তাঁর সন্তুষ্টির জন্য হওয়া উচিত.. :)

Anonymous said...

নোমান আলী খানের বাংলা স্পীচ পডছি মনে হচ্ছিলো!

হাসান তারিক said...

‘আমি জানি ইসলামে অতীতকে বদলে ফেলা যায় বর্তমান দিয়ে...’

‘‘যারা বলতে চান ’হিজাব নারীমুক্তির একমাত্র গ্যারান্টি’, ’হিজাব পড়লে সমাজে শান্তি বজায় থাকবে’, ’হিজাব পড়লে নারী মুক্তার মত ঝকঝকে থাকবে’, তাদের এই কথাগুলো কেউ যদি নিজের ব্যক্তিগত জীবনে ভুল প্রমান করতে পারে, তাহলে কি হিজাব তাদের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যাবে?’’

মুক্তপ্রাণ said...

এটাকেই বলে অন্ধত্ব। শিক্ষিত মানুষের চোখ থাকতেও অন্ধত্ব বলতে কি বোঝায়, তার স্পষ্ট উদাহরণ এই পোস্টটি। দয়া করে পোস্টটি মুছবেন না।

Zeenat said...

ভাল লাগল লেখাটা।
চমৎকার লেখার জন্য ধন্যবাদ।
আপনার বক্তব্যের সাথে আমি সম্পূর্ণই একমত।